ডিজিটাল উন্মাদনা, চলছে কি যন্ত্রের শাসন?
অনলাইন ডেস্ক
প্রযুক্তির দ্রুতগতির যাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে মানবসভ্যতা। কর্মসংস্থান, মানবতা কিংবা আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ; সবকিছু নিয়েই এখন আলোচনা তুঙ্গে। রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বকে গ্রাস করছে, আর মানুষ প্রতিনিয়ত আবদ্ধ হয়ে পড়ছে ডিজিটাল পর্দায়। কিন্তু এই গতিশীল ও জটিল পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আজকের এই বাস্তবতা এক দিনে গড়ে ওঠেনি; অনেক আগেই এমন পরিস্থিতির ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও গবেষকেরা। তারা সতর্ক করেছিলেন যে, প্রযুক্তি হয়তো মানবকল্যাণে ব্যবহৃত একটি আদর্শ সমাজ (ইউটোপিয়া) না হয়ে রূপ নিতে পারে যন্ত্রচালিত রাষ্ট্রে, যেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্থান দখল করবে অ্যালগরিদম ও ডেটা।
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশ দ্রুত গতি পায়। আকার ছোট হয়ে আসার পাশাপাশি বৃদ্ধি পায় এর গতি ও দক্ষতা। সামরিক খাত পেরিয়ে কম্পিউটার ও ডেটা প্রসেসিংয়ের ব্যবহার শুরু হয় ব্যবসা, শিল্প ও চিকিৎসা খাতে। এর হাত ধরেই সমাজ ও রাজনীতির একটি বড় অংশ অটোমেশন বা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ঠিক সে সময়েই জাপানি সমাজবিজ্ঞানী ইয়োনেজি মাসুদা একটি ধারণার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির বিকাশ মানুষকে হয় একটি সর্বজনীন ‘কম্পিউটোপিয়া’র দিকে নিয়ে যাবে, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সুষম সহাবস্থান থাকবে, অথবা তৈরি হবে ‘কম্পিউ-ডাইস্টোপিয়া’ বা যন্ত্রের শাসন।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যন্ত্রের হস্তক্ষেপের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। সে সময় একদল মার্কিন গবেষক ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা দাবি করেন, তারা মানুষের ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক আচরণ পূর্বাভাস দেওয়ার মতো যন্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। ওই একই বছর লন্ডনের কাছে টেডিংটনে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষকেরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতের কম্পিউটার শুধু গান তৈরি কিংবা আইনি সমস্যার সমাধানই করবে না বরং প্রশাসনের শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও মানব মস্তিষ্কের বিকল্প হয়ে উঠবে। পরবর্তীতে নিউইয়র্কে ‘পিপল মেশিন’ তৈরির প্রস্তাব ওঠে, যা ভোটারদের তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্বাচনী কৌশলের দিকনির্দেশনা দেবে। ১৯৫৯ সালে মার্কিন ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি এই ধরনের একটি সিস্টেম ব্যবহার শুরু করে। ইতিহাসবিদ আর্থার শ্লেসিঙ্গার সে সময় এই নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, যন্ত্র অনুমোদন না করা পর্যন্ত একজন নেতা কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না; এমন ভাবনা জননেতৃত্বের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক বিশ্বজুড়ে আরও তীব্র হয়। মার্কিন সমালোচক লুইস মামফোর্ড যন্ত্রনির্ভর এই ব্যবস্থাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সাইবারনেটিক বুদ্ধিমত্তার প্রসার মানুষকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় ও যন্ত্রনির্ভর জীবে পরিণত করবে, যার চিন্তাভাবনা ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে কর্পোরেট ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তার মতে, প্রযুক্তিই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে; এই ধারণা মানব সভ্যতার এক চরম ভুল ব্যাখ্যা। তা সত্ত্বেও তথ্য সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের কাজ থামেনি। ক্রেডিট কার্ড লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত নানান তথ্য ডাটাবেসে রূপ নিতে শুরু করে।
একই সময়ে ইন্টারনেটের আদি রূপের বিকাশ ঘটতে থাকে। প্রযুক্তিবিদ জে সি আর লিকলাইডার ১৯৬০-এর দশকে তথ্য আদান-প্রদানের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে আরপানেট এবং আজকের ইন্টারনেটে রূপ নেয়। লিকলাইডার ও তার সহযোগীরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, মানুষ মুখোমুখি যোগাযোগের চেয়ে যন্ত্রের মাধ্যমে অনেক বেশি কার্যকরভাবে বার্তা পাঠাতে পারবে, গড়ে উঠবে অনলাইন ভিত্তিক সমাজ। তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এর ব্যবহারের ফলে তথ্য বিকৃতি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা সম্পর্কেও তারা সচেষ্ট ছিলেন।
প্রযুক্তির এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে বহু মতবাদ তৈরি হয়। কেউ কেউ মনে করেছিলেন কম্পিউটার প্রযুক্তি প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্রের মতো সরাসরি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। আবার অনেকেই এর নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। প্রথম চ্যাটবট ‘এলিজা’র স্রষ্টা জোসেফ উইজেনবাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাজ স্বয়ংক্রিয় করার কঠোর বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি আন্তঃব্যক্তিক অনুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় কম্পিউটার বসানোর প্রচেষ্টাকে অনৈতিক বলে উল্লেখ করেন। তবে গবেষকদের এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করেই রাজনীতিক ও কর্পোরেট খাত ক্রমাগত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে থাকে। ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে তথ্যভিত্তিক কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করা হয়।
নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং ‘টেকনো-লিবারটেরিয়ানিজম’ বা প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের উত্থান হয়। সিলিকন ভ্যালির অনেক বিনিয়োগকারী ও উদ্ভাবক মনে করতে শুরু করেন যে মুক্ত বাজার এবং প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাই বিশ্বের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করবে। তৎকালীন রাজনীতিবিদরাও এই খাতে কোনো প্রকার সরকারি নিয়ন্ত্রণ না রাখার নীতি গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টেলিযোগাযোগ আইন শিথিলের মাধ্যমে ইন্টারনেটকে কার্যত অনিয়ন্ত্রিত একটি বাণিজ্য ক্ষেত্রে পরিণত করার পথ পরিষ্কার করা হয়। একই সাথে, ইন্টারনেটে ভুয়া তথ্য, হিংসাত্মক মন্তব্য এবং ট্রোলিংয়ের মতো সামাজিক অপরাধগুলো আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে।
আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে এ কথা স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় প্রযুক্তির এই অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বিগত কয়েক দশকের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং উদার গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর উদাসীনতারই ফল। ইতিহাস থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও কর্পোরেট স্বার্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে সেসব সতর্কবাণী হারিয়ে গেছে। যার ফলে মুক্ত ও মানবিক গণতন্ত্র আজ যন্ত্রের হিসাব-নিকাশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
