দূরত্ব, আস্থা আর আপনজনের রাজনীতি

জিল্লুর রহমান

এই সপ্তাহের চারটি বিষয় চার জগতের- রাজনীতি, ভূরাজনীতি, অর্থনীতি আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। প্রথম দেখায় এদের মধ্যে কোনো মিল নেই। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, চারটিই ঘুরেফিরে এসে দাঁড়ায় একই জায়গায়-ক্ষমতার সঙ্গে দূরত্ব, সিদ্ধান্তের সঙ্গে দায়িত্ব, পরিসংখ্যানের সঙ্গে বিশ্বাস এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। বঙ্গভবন থেকে তাইওয়ানের সমুদ্র, জ্বালানিসংকট থেকে সাগর ভাইয়ের আপনজনের জগৎ-সবখানেই শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই : আমরা কাকে কতটা বিশ্বাস করি, আর সেই বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য কতটা দূরত্ব দরকার?

১. বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করেছে। মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি মহাসচিবসহ দলীয় সব পদ থেকে থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি নিছক একটি সাংবিধানিক পদে মনোনয়নের ঘটনা নয়; এর মধ্যে একটি সময়ের অবসান এবং আরেকটি সময়ের সূচনা আছে।

মির্জা ফখরুলকে আমি বহুদিন ধরে চিনি। তাঁর রাজনীতির সঙ্গে একমত হওয়ার প্রশ্ন আলাদা, কিন্তু তাঁর ভদ্রতা, সংযম, পরিমিত ভাষা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ধৈর্য অস্বীকার করা কঠিন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলাকে অনেক সময় শক্তির পরিচয় মনে করা হয়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে যত কঠিন ভাষায় আক্রমণ করা যায়, যেন জনপ্রিয়তাও তত বাড়ে। সেই জায়গায় মির্জা ফখরুল বরাবরই একটু আলাদা। শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিতে আসা একজন মানুষের ভাষায় যে পরিমিতি থাকে, তাঁর মধ্যে সেটি অনেক সময়ই দেখা গেছে।

তিনি এমন এক সময় বিএনপির মুখ ছিলেন, যখন দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে, শীর্ষ নেতৃত্ব নানা সংকটে, নেতা-কর্মীদের বড় অংশ মামলা-মোকদ্দমা ও রাজনৈতিক চাপে। সেই সময় দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, সংগঠন ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক সংলাপের ভাষা বজায় রাখা সহজ ছিল না। তিনি সেই কাজটি করেছেন।

এখন তাঁর সামনে বড় পরীক্ষা। বঙ্গভবনে গেলে বিএনপির নেতা নন; তাঁকে রাষ্ট্রের অভিভাবক হতে হবে। দলীয় স্মৃতি তাঁর থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রপতির আসনে বসে দলীয় সীমা অতিক্রম করতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ বহু সময় আনুষ্ঠানিক বলে বিবেচিত হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের সময়ে ব্যক্তিত্ব, সংযম এবং নৈতিক অবস্থান অনেক বড় হয়ে ওঠে। মির্জা ফখরুল যদি সেই জায়গায় দল থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব রাখতে পারেন, তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সম্মানজনক অধ্যায়টি হয়তো এখনই শুরু হবে।

২. তাইওয়ানের জলসীমায় নতুন হিসাব

চীন চলতি মাসে তাইওয়ানের পূর্ব দিকের সমুদ্রসীমার কাছে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ার পরিকল্পনা করেছে। বেইজিং বলছে, এটি নৌচলাচলভিত্তিক একটি মহড়া। তাইপে বলছে, এর মাধ্যমে চীন ওই জলসীমার ওপর নিজের কর্তৃত্বের ধারণা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাইওয়ানের কাছে বিদেশি কোনো নৌবাহিনীকে নিয়ে চীনের এ ধরনের মহড়া অস্বাভাবিক, এবং তাই ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

এখানে মূল বিষয় শুধু একটি সামরিক মহড়া নয়। নতুন বিষয় হলো ইন্দোনেশিয়ার উপস্থিতি। এত দিন তাইওয়ানকে ঘিরে আলোচনায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফিলিপাইন বা অস্ট্রেলিয়ার নাম বেশি শোনা গেছে। এখন রাষ্ট্রপতি পদসেখানে ইন্দোনেশিয়ার নামও যুক্ত হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ হিসেবে জাকার্তার প্রতিটি পদক্ষেপের আলাদা গুরুত্ব আছে।

ইন্দোনেশিয়ার কূটনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ভারসাম্যের। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক তার প্রয়োজন, আবার অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে হয়। তাই চীনের খুব কাছে যাওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি খুব দূরে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এই টানাপোড়েন শুধু ইন্দোনেশিয়ার নয়; বাংলাদেশের মতো মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্যও এটি শিক্ষা।

আজকের বিশ্বে নিরপেক্ষতা মানে নীরব থাকা নয়, বরং নিজের সিদ্ধান্তের মালিক থাকা। সবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু কারও ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া যাবে না। বড় শক্তিগুলো ধীরে ধীরে তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তোলে। প্রথমে যে ঘটনাটি অস্বাভাবিক মনে হয়, কয়েক বছর পর সেটিই নিয়মে পরিণত হয়।

রাজনীতিতেও একই কথা। কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রথমবার দলীয় প্রভাব বিস্তার হলে আমরা চমকে উঠি। পরে সেটি বারবার ঘটতে থাকলে অভ্যাস হয়ে যায়। অস্বাভাবিকতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

৩. জ্বালানিসংকট, মূল্যস্ফীতি আর বিশ্বাসের ঘাটতি

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর চাপ এখন আর নতুন খবর নয়। শিল্প খাতের বড় অংশ গ্যাসসংকটের কারণে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। নীতি-বিশ্লেষকরা বলছেন, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা দিয়ে শুধু আগুন নেভানো যাবে; দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৌশলগত মজুত, সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নতি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।

সরকার আরও তিনটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসীকরণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এতে সরবরাহ বাড়তে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও আমদানিনির্ভর সমাধানের দিকে বেশি ঝুঁকছি? নতুন কেন্দ্র দরকার হতে পারে, কিন্তু এটিই যদি নীতির মূল স্তম্ভ হয়, তাহলে রোগের চিকিৎসার বদলে আমরা কেবল স্যালাইনের বোতল বাড়াচ্ছি।

জ্বালানি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও বিষয়। কারখানা আছে, শ্রমিক আছে, রপ্তানির ক্রয়াদেশ আছে, ব্যাংকঋণ আছে-কিন্তু গ্যাস নেই, তাহলে পুরো উৎপাদনযন্ত্র থেমে যায়। একটি দেশের দুর্বলতা অনেক সময় সীমান্তে নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহে লুকিয়ে থাকে।

এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ সেই স্বস্তি অনুভব করছে না। এখানে একটি সাধারণ ভুলও আছে- মূল্যস্ফীতি কমা মানে পণ্যের দাম কমা নয়; দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমা। কিন্তু মানুষের প্রশ্নটা তবু অযৌক্তিক নয়। কারণ পরিসংখ্যানের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের দূরত্ব বেশি হলে সন্দেহ জন্মায়।

ঠিক এই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের বাকি মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। কারণ স্পষ্ট না হলে স্বাভাবিকভাবেই নানা জল্পনা তৈরি হয়। আমি প্রমাণ ছাড়া কোনো সংখ্যাকে মিথ্যা বলব না, আবার প্রশ্ন তোলাও বন্ধ করতে বলব না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার মজুত নয়, মানুষের বিশ্বাসও। সরকারি তথ্য যদি বিশ্বাসযোগ্য হয়, সিদ্ধান্তের কারণ যদি ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে কঠিন সময়েও মানুষ সহনশীল থাকে। আস্থা একবার ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর চেয়েও কঠিন।

৪. সাগর ভাই, বই আর আপনজনের হিসাব

ফরিদুর রেজা সাগরের সঙ্গে আমার পরিচয় বহু বছরের। তাঁকে আমি বহুদিন ধরে জানি, কিন্তু বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে তাঁর নাম চিনেছি তারও আগে। তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর চারপাশে অসংখ্য মানুষের গল্প জমে আছে। আমি তাঁকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক বটবৃক্ষ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ তিনি শুধু নিজে কাজ করেননি, অন্যদের কাজ করার জায়গাও তৈরি করেছেন।

একসময় আমি পত্রিকায় কাজ করতাম। পরে চ্যানেল আইয়ে প্রথমে কিছু পরীক্ষামূলক অনুষ্ঠান, তারপর নিয়মিত তৃতীয় মাত্রা শুরু করলাম। দেখতে দেখতে প্রায় চব্বিশ বছর। এত দীর্ঘ পথচলায় সাগর ভাইয়ের স্নেহ, আস্থা ও ভালোবাসা পেয়েছি। আমাদের অফিসের ঘরের দূরত্ব মাত্র দুই কদম, অথচ প্রয়োজন ছাড়া কথা খুব বেশি হয় না। কিছু সম্পর্ক আছে, যেখানে প্রতিদিন কথা বলতে হয় না; জানলেই হয়, মানুষটি পাশে আছে।

আমি বইয়ের উৎসর্গপত্র পড়তে ভালোবাসি। কারণ বই সবার জন্য লেখা হলেও উৎসর্গ কয়েকজনের জন্য। সাগর ভাইয়ের বইয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় শ। অনেক বই পড়েছি, অনেক বই অন্তত হাতে নিয়েছি। মনের মধ্যে একটা ছোট্ট হিসাব অবশ্য বহুদিন ধরেই মিলছিল না-চারপাশের এত মানুষকে তিনি বই উৎসর্গ করেন, আমাকে করেন না!

কয়েক বছর আগে তিনি বললেন, আমাকে আর আমার স্ত্রী ফাহমিদাকে একটি বই উৎসর্গ করেছেন। কৌতূহল নিয়ে বইটি চাইলাম। তিনি তাঁর লোকজনকে দিতে বললেন। কেউ কেউ সাক্ষীও দিলেন, কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পর বইটি আর পাওয়া গেল না। আমিও ভাবলাম, হয়তো উৎসর্গ হয়েছে, বইটাই আমাকে পছন্দ করেনি!

সম্প্রতি তাঁর বই ‘প্রিয়জন আপনজন’ বেরিয়েছে। কাছ থেকে দেখা দেশ পরিচিত ১০০ জনকে নিয়ে। বইটি হাতে নিয়ে আমি অবাক, সেই ১০০ জনের মধ্যে আমিও আছি। সাগর ভাইয়ের পরিচিত মানুষের পরিধি এত বড় যে তাঁর ১ হাজার মানুষের তালিকাতেও আমি আছি কি না সন্দেহ ছিল। সেখানে ১০০ জনের মধ্যে নিজের নাম দেখে আনন্দের সঙ্গে একটু লজ্জাও লাগল।

বইটি আসলে ১০০টি জীবনী নয়; এটি সম্পর্কের বই। মানুষকে পদ, পরিচিতি বা সাফল্যের তালিকায় না দেখে একজন আরেকজনকে কীভাবে মনে রাখে, সেটিই এখানে বড়। অন্যদের নিয়ে লিখতে লিখতে সাগর ভাই নিজের জীবনও লিখে ফেলেছেন। কারণ একজন মানুষের আত্মকথা শুধু সে কী করেছে তা দিয়ে হয় না; সে কাদের সঙ্গে চলেছে, কাদের ভালোবেসেছে, কার পাশে দাঁড়িয়েছে। সেটিও তার জীবনের অংশ।

আমার প্রস্তাব, এই বইয়ের যাঁরা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁদের দিয়ে এবার সাগর ভাইকে নিয়ে লেখা হোক। তিনি আমাদের নিয়ে লিখেছেন, এবার আমরা তাঁকে নিয়ে লিখি। বইয়ের নাম হতে পারে- ‘আমাদের প্রিয়জন : ফরিদুর রেজা সাগর’।

শেষ কথা

এই চারটি গল্প আলাদা মনে হলেও এক জায়গায় এসে মিলে যায়, দূরত্ব আর আস্থায়। মির্জা ফখরুলের সামনে দল থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব রেখে রাষ্ট্রের অভিভাবক হওয়ার পরীক্ষা। ইন্দোনেশিয়ার সামনে বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার পরীক্ষা। সরকারের সামনে জ্বালানি ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি সরকারি তথ্যের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাসের দূরত্ব কমানোর পরীক্ষা। আর সাগর ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয়-দূরত্ব কম হলেই সম্পর্ক গভীর হয় না, আবার দূরে থেকেও মানুষ খুব আপন হতে পারে।

রাষ্ট্র হোক বা ব্যক্তি, শেষ পর্যন্ত আমরা মনে রাখি না কে কত বড় পদে ছিল, কার কত শক্তি ছিল, কিংবা পরিসংখ্যানে কত দশমিক কত লেখা ছিল। আমরা মনে রাখি মানুষটি বিশ্বাসযোগ্য ছিল কি না, প্রয়োজনের সময় পাশে ছিল কি না।

আস্থা এমন এক জ্বালানি, যা বিদেশ থেকে আমদানি করা যায় না। আর একবার ফুরিয়ে গেলে তার সংকট বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সংকটের চেয়েও গভীর।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights