নড়াইলে ভোঁদড় পল্লীতে দুইদিনব্যাপী সুলতান উৎসব
শুভ সরকার , নড়াইল থেকে
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০১তম জন্মদিন উপলক্ষে নড়াইল সদর উপজেলায় দুইদিনব্যাপী সুলতানের জন্মশতবর্ষ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ গতকাল শুক্রবার উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা গোয়াইলবাড়িতে ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করা জেলে পল্লীতে সুলতানের জীবন সম্পর্কে আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে এ উৎসব শুরু হয়। এরপর শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, তাদের চিত্রপ্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শনিবার এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। ওই পল্লীর শিল্প সংগঠন ‘চারু প্রাঙ্গণ শিল্পালয়’ এ উৎসবের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে এস এম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন এবং অটার ফিশিং কমিউনিটি বাংলাদেশ।
শনিবার বিকালে সরেজমিন পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, উৎসবের আবহে পিছিয়ে পড়া পল্লীর মানুষের মাঝে অন্য রকম প্রাণচাঞ্চল্য। মাছ ধরার নৌকা বাঁধা পাশের চিত্রা নদীর ঘাটে, ভোঁদড় খাঁচায় আছে শান্তভাবে, আর তার পাশে শিল্পচর্চায় ব্যস্ত শিশুরা। ভোঁদড় পল্লীর পাশাপাশি পাশের এলাকার কয়েকজন শিশুকে সেখানে ছবি আঁকতে দেখা যায়। কোনো কচি হাতে রঙের ছোঁয়ায় জেগে উঠছে ভোরের আকাশে লাল–কমলার আগুনঝরা সূর্য, আবার কারও ছবিতে নদীর বুকে পাল তুলে ভেসে চলেছে নৌকা। কারও তুলিতে সোনালি ধানের মাঠে ঝরে পড়ছে কৃষকের ঘাম, কেউ আবার ক্যানভাসে বন্দি করেছে গ্রামবাংলার সরল প্রাকৃতিক দৃশ্য ।
ছবি আঁকা শেষে প্রিয়াংকা বিশ্বাস নামে তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী ভোরের কাগজকে বলেন, চিত্রশিল্পী সুলতানের জন্মদিন উপলক্ষে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হচ্ছে। আমি সুলতানের একটি ছবি এঁকেছি। আমার খুব ভালো লাগছে।
গ্রাম বাংলার চিরচেনা একটি দৃশ্য এঁকেছে শিক্ষার্থী লেখা বিশ্বাস। সে বলে, ” আমার সঙ্গে আরো অনেকে এসেছে ছবি আঁকতে। আমার ছবিতে একটি গ্রামের ছবি এঁকেছি। ছবিতে কয়েকটি ঘরবাড়ি রয়েছে। তাঁর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। সেখানে চলছে নৌকা। আকাশে পাখি উড়ছে৷ আমরা সবাই মিলে খুবই আনন্দ করছি। ”
চিত্রাঙ্কনের সময় শিশুদের সঙ্গে থেকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন তাদের প্রশিক্ষক চিত্রশিল্পী ডি. ডি. মল্লিক। তিনি বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের শিষ্য। গুরু সুলতানও তাদের খোলা প্রকৃতির মাঝে ছবি আকা শেখাতেন- সেকথা স্মরণ করে ডি.ডি মল্লিক বলেন, ”চার দেওয়ালের মধ্যে থেকে মনে করে কিংবা অনুমান করে ছবি আঁকা যায় না। আমি চাই ছেলেমেয়েকে প্রকৃতির মাঝে নিয়ে আসতে। যাতে ফুল-পাতা সে ছুঁয়ে দেখতে পারে। তাহলে তার শেখাটা ভালো হয়। সে আরও সুন্দর করে ছবিটা ফুটিয়ে তুলতে পারে৷ এ কারণেই নদীর পাড়ে খোলা পরিবেশে এ আয়োজন করা হয়েছে। ”
আয়োজক সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করা জেলেদের এই পল্লীর শিশুরা বেশির ভাগ সময়ই নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও তারা অবহেলিত। তাই তাদের কথা ভেবে নয় মাস আগে ওই পল্লীতে ‘চারু প্রাঙ্গণ শিল্পালয়’ নামে একটি শিল্প সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ‘লতিকা’ খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সামছুল ইসলাম স্বপন। এরপর থেকে বিনা পারিশ্রমিকে ওই সংগঠনটির পক্ষ থেকে ভোঁদড় পল্লী ও এর আশপাশের এলাকার শিশুদের চিত্রাঙ্কন শেখানো হচ্ছে।
সামছুল ইসলাম স্বপন ভোরের কাগজকে বলেন , দুইদিনব্যাপী এ উৎসব করার উদ্দেশ্য শিশুদের সঙ্গে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের পরিচয় করানো। যাতে সুলতানের চিত্রকর্ম দেখে শিশুরা অনুপ্রেরিত হতে পারে, নিজ অঞ্চল ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে।
ছবি আঁকা শেষ হলে বিকেলে সেগুলো পাশে অবস্থিত গোয়াইলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় প্রদর্শিত হয়। পল্লী ও আশেপাশের মানুষ সেখানে ভিড় করেন। সন্ধ্যার দিকে বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে আলোচনা সভা হয়। পরে শিশুদের সামনে বড় পর্দায় সুলতানের জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আদম সুরত’ প্রদর্শিত হয়। দুইদিনব্যাপী এ উৎসবে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসএম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ হানিফ, এপেক্সের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান আরিফুর রহমান খান, নড়াইল আব্দুল হাই সিটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সসীম কুমার সরকার, এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জি, নড়ইল বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক মো. ফরহাদ হোসেন, ব্রাকের জেলা সমন্বয়ক জাহিদুল ইসলাম। এছাড়াও চারু প্রাঙ্গণ শিল্পালয়ের সভাপতি কল্যাণ কুমার বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত কুমার বিশ্বাস ও সদস্য বিশাল বিশ্বাসসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিরা প্রত্যন্ত একটি জেলে পল্লীতে এমন আয়োজনের প্রশংসা করেন এবং শিশুদের আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। এসএম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ হানিফ বলেন, ”জেলে পল্লীর শিশুরা এতো ভালো ছবি আঁকে – এটা আমার কাছে খুবই অবাক লাগছে। আগামী দিনে অনেক ভালো কিছু এই জনপদ থেকে বের হবে এটা আমার বিশ্বাস।। ”
নড়াইল-১৭.০৮.২০২৫
