নিম্ন-মধ্যম আয়ের ৬০ হাজার পরিবার পাবে আবাসন ঋণ

ইমরান চৌধুরী

বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৬০ হাজার পরিবারকে বাড়ি নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও মেরামতের জন্য ঋণ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এজন্য প্রস্তাবিত ‘ইনক্লুসিভ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং ফাইন্যান্স প্রজেক্ট’-এর আওতায় ১০ কোটি ডলার বা প্রায় ১ হাজার ২২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ দেবে সংস্থাটি। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) প্রায় ৪০টি অংশীদার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই অর্থ ৬০ হাজার পরিবারের মধ্যে বিতরণ করবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির বিষয়ে এডিবি ইতোমধ্যে তথ্য-অনুসন্ধান মিশন শেষ করেছে। এখন প্রস্তাবটি এডিবির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, একজন ঋণগ্রহীতা গড়ে ২ লাখ টাকা পাবেন। সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ হবে কমপক্ষে পাঁচ বছর। মাসে ৩০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করে-এমন পরিবারগুলো এ ঋণের জন্য যোগ্য হবে। ঋণের মাসিক কিস্তি পরিবারের মাসিক আয়ের ৩০ শতাংশের কম রাখার কথা রয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত ঋণের সুদের হার এখনো নির্ধারণ হয়নি। পিকেএসএফের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক এ কে এম নূরুজ্জামান জানান, সরকার থেকে পিকেএসএফ, পিকেএসএফ থেকে অংশীদার প্রতিষ্ঠান এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণগ্রহীতাদের পর্যায়ে কী সুদের হার হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।

আবাসন ঋণতিনি বলেন, ঋণচুক্তি সইয়ের আগে অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সুদের হার নির্ধারণ করা হবে। এডিবির অর্থায়নে পাওয়া অর্থ পিকেএসএফের কাছে কী ব্যয়ে আসছে, তার ওপর ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার অনেকাংশে নির্ভর করবে।

নতুন তহবিল পিকেএসএফ কম সুদে পেলে বিদ্যমান আবাসন ঋণ কর্মসূচির তুলনায় কম সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পিকেএসএফ নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৯ সালে ‘আবাসন’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় বাড়ি নির্মাণ, মেরামত ও সম্প্রসারণের জন্য এখন পর্যন্ত ৫১ হাজার ২৪৬ জনকে ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো পিকেএসএফ থেকে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল পায় এবং ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বছরে ১২ শতাংশ সুদ নেয়। এ ক্ষেত্রে কোনো গোপন ফি নেওয়া হয় না। প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পে ঋণের ৮০ শতাংশ জামানত ছাড়াই দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাড়ি নির্মাণ, মেরামত বা সম্প্রসারণের ব্যয়ের একটি অংশ ঋণগ্রহীতাকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হবে।

এডিবির প্রস্তাবিত যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীর বয়স সাধারণত ২১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।

তাঁর নিজস্ব অথবা আইনগতভাবে দখলে থাকা কমপক্ষে শূন্য দশমিক ৮ ডেসিমেল বসতভিটার জমি থাকতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক অথবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) হিসাব থাকতে হবে। কোনো ঋণখেলাপির রেকর্ডও থাকা যাবে না। বিধবা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে অগ্রাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা থাকতে হবে।

এডিবির নথিতে বাংলাদেশের সাশ্রয়ী আবাসন ও আবাসন অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে আবাসনের ঘাটতি প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট। ২০৩০ সাল নাগাদ এই ঘাটতি বেড়ে ১ কোটি ৫ লাখ ইউনিটে দাঁড়াতে পারে। নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩১ হাজার ৫০০টি আবাসন ইউনিট নির্মিত হয়, যা আনুমানিক চাহিদার প্রায় ১ শতাংশ। পাশাপাশি প্রায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এখনো বস্তিতে বসবাস করছে।

এডিবির নথিতে আরও বলা হয়েছে, বন্ধকভিত্তিক আবাসন ঋণ মূলত উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত। ২০২৩ অর্থবছরে বন্ধকি ঋণের পরিমাণ ছিল দেশের জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আনুষ্ঠানিক জমির মালিকানার দলিলের অভাব, জামানতের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ কম থাকা এবং সাশ্রয়ী ঋণপণ্যের ঘাটতির কারণে আবাসন ঋণ থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

প্রস্তাবিত ১০ কোটি ডলারের ঋণ বাস্তবায়িত হলে পিকেএসএফের মাধ্যমে ৬০ হাজার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের বাড়ি নির্মাণ, সম্প্রসারণ বা মেরামতের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights