পর্যটন নগরীকে এখনই বাঁচান
অদিতি করিম
শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে রিসোর্টটির বড় অংশ পুড়ে যায়। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত, এই মৃত্যু বেদনার। কক্সবাজারের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু কক্সবাজার নয় সারাদেশকে শোকের সাগরে ভাসিয়েছে। গোটা দেশ শোকে স্তব্ধ। যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে তাদের জন্য কোন সান্ত্বনাই যথেষ্ট নয়। এই ট্রাজেডি এই পরিবার গুলো জন্য এক চিরস্থায়ী দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে। তবে এই মৃত্যু আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এতোগুলো মৃত্যু দেখিয়ে দিলো পর্যটন নগরী কত অরক্ষিত, কতটা ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে, কক্সবাজার মৃতপ্রায়। অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ এবং অবৈধ দোকানপাট নির্মাণের ফলে কক্সবাজারের সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়ে গেছে। এই চমৎকার সমুদ্রসৈকত এখন তার রূপ রস যৌবন হারিয়েছে।
অপার সম্ভাবনাময় দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। প্রতি বছর কয়েক লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ছুটে আসেন সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের একটি অভিযোগ বারবার সামনে আসছে—কক্সবাজারে প্রকৃতির চেয়ে বাণিজ্যের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে। কেউ কেউ বলেন, কক্সবাজার আসলেই বাজার, সমুদ্রের কিছু নেই। ফলে যে কারও প্রশ্ন জাগতে পারে, কক্সবাজার কি ধীরে ধীরে সমুদ্রের শহর থেকে বাজারের নগরীতে পরিণত হচ্ছে? কিন্তু পর্যটকদের এসব অভিযোগ কেউ কর্নপাত করেনি।
কক্সবাজার সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে গেলেই দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। সমুদ্রের ঢেউয়ের পাশাপাশি চোখে পড়ে সারি সারি অস্থায়ী দোকান, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, বিচ বাইক, ঘোড়া, ফটোগ্রাফারসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অনেক পর্যটকের অভিযোগ, কিছুক্ষণ নিরিবিলি বসে সমুদ্র উপভোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দূর থেকে দেখলে যে কারও বাজারই মনে হবে। এটি এখন বাস্তব চিত্র।
শুধু সৈকত নয়, শহরের সড়কেও একই অবস্থা। পর্যটন মৌসুমে কলাতলী, সুগন্ধা ও ঝাউতলা এলাকায় দীর্ঘ যানজট নিত্যদিনের ঘটনা। অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল ও অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে। অনেকের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। এজন্য লম্বা ছুটি ও যেকোনো উৎসবে ঘুরতে এলে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
কক্সবাজারের প্রধান সম্পদ সমুদ্র, বালুচর ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। কিন্তু অপরিকল্পিত বাণিজ্য, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম সৈকতের পরিবেশকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দিন শেষে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক বোতল, খাবারের মোড়ক ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব বর্জ্য শুধু সৌন্দর্য নষ্ট করে না, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা থাকে। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য থাকে শান্ত পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন সৈকত ও উন্নত নাগরিক সুবিধা। কক্সবাজারেও সৈকত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পরিকল্পনা, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং এবং যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি।
কক্সবাজারের সৈকতসংলগ্ন প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে চলেছে বহুতল ভবন। গত তিন দশকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় ৭০০টির বেশি বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। যেসব ভবনের উচ্চতা ৪ থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত। এসব ভবনের মধ্যে আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস রয়েছে ৫৩৭টি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ ভবনের মধ্যে কেবল তারকা মানের ১৪টি ভবনে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) আছে। পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৪৫টির। বাকিগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।
অধিকাংশ হোটেলে এসটিপি না থাকায় হোটেলের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা সাগরে মিশছে। পৌর এলাকায় ময়লা ফেলার ডাম্পিং স্টেশনও নেই। ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশেও এক দশক ধরে ভবন নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে। এতে সৈকতসংলগ্ন ঝাউবাগান উজাড় হচ্ছে এবং লাল কাঁকড়া ও মা কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
রীতিমতো অরাজকতা এবং নৈরাজ্য চলছে কক্সবাজারে। কিছু মানুষের মুনাফা লোভ এবং দায়িত্বহীনতা কারণে কক্সবাজার যে এক মৃতকুপে পরিণত হয়েছে তা শনিবারের দুর্ঘটনায় প্রমাণিত হলো।
ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্ট পরিচালনা বন্ধ করতে গত এপ্রিলে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ–সংলগ্ন টুপটুপ রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্টকে নোটিশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। নির্দেশনা না মানায় তাদের এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। মেরিন ড্রাইভ–সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টের কার্যক্রম পরিচালনা করায় আরও ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে এ বছরের এপ্রিল থেকে নানা সময়ে নোটিশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে নোটিশ অমান্য করায় জরিমানা করা হয় ১৪টি রিসোর্টকে। মামলা করা হয় দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে। বাকি ১০টিকে নোটিশ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ–সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা ঘোষণা করে সরকার। টুপটুপসহ আরও অনেক রিসোর্ট এসব ইসিএ এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। এসব রিসোর্ট বন্ধ করার পদক্ষেপ নিলে নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয় পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে আরও ১৪৫টি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট আছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। মেরিন ড্রাইভ–সংলগ্ন ইসিএ এলাকায় নির্মিত এসব রিসোর্টকে নানা সময়ে জরিমানা করা হলেও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।এভাবেই আইন অমান্য করে কক্সবাজারকে প্রতিনিয়ত হত্যা করা হচ্ছে। এবারের মৃত্যু জানিয়ে দিলো কক্সবাজার পর্যটকদের জন্য কতটা অনিরাপদ। এই মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর বেদনার। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কক্সবাজার কে বাঁচাতে হলে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। কক্সবাজারকে রক্ষার জন্য আমরা নানা সময়ে নানা আশ্বাস শুনি। অনেক পরিকল্পনার কথা শুনি। কিন্তু কক্সবাজার যে এখন কি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে, এই মৃত্যু তার প্রমাণ। এই মৃত্যু জানিয়ে দিলো, কক্সবাজারকে বাঁচাতে হলে আর এক মুহূর্ত দেরি করা যাবে না।অবিলম্বে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করতে হবে। বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনকে বাঁচাতে হলে এই নগরীর সব অনিয়ম দূর করতে হবে কঠোর হাতে। দশ পর্যটকের মৃত্যুর পর কি আমাদের ঘুম ভাঙবে?
লেখক : লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : auditekarim@gmail.com
