পাঁচ দেশের পাসপোর্ট, তুর্কি পরিচয়, কিছুই রক্ষা করল না বেনজীরকে

অনলাইন ডেস্ক

একসময়কার প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত।

নিজেকে তুরস্কের নাগরিক পরিচয় দিয়ে এবং পাঁচটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইন ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত সফল হননি তিনি। দুবাই পুলিশের কাছ থেকে পরিচয় নিশ্চিত করতে চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারও আনুষ্ঠানিকভাকে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে তৎপর। আমিরাত সরকারও তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিকতার ইঙ্গিত দিয়েছে। চিঠি চালাচালির এই প্রক্রিয়ায় দ্রুতই বেনজীরকে দেশে ফেরত আনা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশের এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আইনি জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বেনজীর আহমেদের বিচার সম্পন্ন করা গেলে দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-নীতির একটি মাইলফলক রচিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘বিদেশ থেকে অপরাধী ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। সব বাধা দূর করে বেনজীর আহমেদকে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করা গেলে সরকারের জন্য এটি বড় একটি সাফল্য হয়ে থাকবে। দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারাও ম্যাসেজ পাবে দুর্নীতি করে বিদেশে পালিয়ে থাকা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘বেনজীর আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সময় পেশাদারির বাইরে গিয়ে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে ফিরিয়ে এনে শাস্তি দিতে পারলে পুলিশ বাহিনীও ম্যাসেজ পাবে, পেশাদারির বাইরে গিয়ে বিদেশে পালিয়েও শেষরক্ষা পাওয়া যায় না।’

জানা গেছে, দুবাই পুলিশ যখন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে, তখন তিনি নিজেকে তুরস্কের নাগরিক দাবি করে ওই দেশের পাসপোর্ট প্রদর্শন করেন।

পরে নিবিড় তল্লাশিতে তাঁর কাছে ভিন্ন ভিন্ন পাঁচটি দেশের পাসপোর্টের তথ্য পায় ওই দেশের পুলিশ। এর মধ্যে প্রথম পাসপোর্টটি বাংলাদেশের। এ ছাড়া পর্তুগালসহ আরো দুটি দেশের পাসপোর্টও নেন তিনি।

গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আবুধাবির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ই-মেইলের মাধ্যমে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানোর বিষয়েও বলেন তিনি। গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে তাঁকে ফেরত আনার প্রস্তুাব পাঠানোর বিষয়টিও সেদিন জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দুবাই থেকে চিঠি আসার পর এক সপ্তাহের মধ্যে বেনজীরকে ফেরত আনার প্রস্তাব পাঠানো হয়। দুবাই পুলিশ ওই প্রস্তাব পাওয়ার পর দ্রুত ফিরতি চিঠি পাঠিয়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তি প্রকৃতই বেনজীর আহমেদ কি না, তা জানতে চেয়ে গত সপ্তাহে চিঠি পাঠিয়েছে। সঙ্গে তাঁকে গ্রেপ্তারের নথিপত্র ও ছবিও পাঠানো হয়। এ ছাড়া মামলার নথিসহ বেশ কিছু বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা চেয়েছে বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিলম্ব না করে তিনি প্রকৃত বেনজীর আহমেদ জানিয়ে আরবি ভাষায় একটি চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।

বেনজীর আহমেদকে ফেরত পাঠানোর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ মামলার নথিসহ বেশ কিছু বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা চেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে সেই জবাব প্রস্তুত করছে বলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদক বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজের প্রভাব খাটিয়ে বেনজীর দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং বাণিজ্যিক শেয়ার কিনেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে পরিচয় লুকিয়ে বিদেশ ভ্রমণের পৃথক অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে দুদকের অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতির মামলা রয়েছে, যার মধ্যে একটির বিচার চলছে, বাকিগুলো তদন্তাধীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights