পুরুষ যে সুবিধা পায়, নারীও যেন তা পায়

আজমেরী হক বাঁধন, অভিনেত্রী

আমরা অনেক কিছুর পরিবর্তন চাই, কিন্তু সবার আগে নিজের দেশকে মনের মধ্যে ধারণ করার ব্যাপারটা থাকতে হয়। যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন, মাতৃভূমির প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা, মমতাবোধ থাকা দরকার। আমি যদি দেশটাকে নিজের মনে না করি, তাহলে মনে হবে, দেশের কী হবে আমার জানার দরকার নেই, আমি তো অন্য কোথাও গিয়ে ভালো থাকতে পারব। তাই প্রত্যেকের নিজ দেশকে মনের মধ্যে ধারণ করা জরুরি।

এখন আমি যে দেশে জন্মেছি, সেটা কেমন? এটা খুবই অল্পবয়সী একটা দেশ। আমাদের স্বাধীনতার বয়স খুব বেশি না। পৃথিবীর সমৃদ্ধ বা প্রভাবশালী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের স্বাধীনতার বয়স তেমন হয়নি। কিন্তু আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব আছে, আছে সবচেয়ে বেশি প্রাণশক্তি। সেটা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের নিরীহ সাধারণ মানুষ প্রশিক্ষিত না হয়েও যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে আমি রাস্তায় থেকে আন্দোলন করেছি। আমি দেখেছি, মানুষের কী পরিমাণ সাহস ও প্রাণশক্তি। দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারবে এমন প্রাণশক্তি আছে তাদের।

আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আছে। এই সব কিছু নিছক মুখে মুখে, তা আমি মনে করি না। ছোটবেলা থেকে এটা দেখেই বড় হয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে বাঁধন হিসেবে আমি যতটা সচেতন ছিলাম, মা হওয়ার পর তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সচেতন হয়েছি। আমার স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে। বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে আমাকে দিয়েই আমার সন্তান নিজের পরিচয়টা তৈরি করবে। ওর কী অধিকার আছে, কতটা স্বাধীনতা আছে, সেটা আমাকে দেখেই শিখবে। সমাজব্যবস্থায় নারী হিসেবে আমাদের যেভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়, সেই জায়গা থেকে মনে হতো, ঠিকই আছে। অনেক দেশে কথা বলার অধিকার পর্যন্ত নেই, পড়াশোনার অধিকার নেই। তার চেয়ে তো ভালোই আছি। কিন্তু মা হওয়ার পর উপলব্ধি করেছি, আমার পুরোটাই লাগবে। এই দেশের নাগরিক হিসেবে একজন পুরুষ যে যে সুবিধা পায়, একজন নারীও যেন একই সুবিধা পায়, এটা আমি নিশ্চিত করতে চাই।

চর্চাটা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। এ ক্ষেত্রে আইনি কিছু জটিলতা আছে। উত্তরাধিকার আইন, অভিভাবকত্বের আইনসহ বেশ কিছু আইন আছে, যেগুলো দিয়ে খুব সিস্টেমেটিক্যালি নারীদের বঞ্চিত করা হয়। এই বঞ্চনা থেকে আমার সন্তান ও সমাজকে মুক্ত দেখতে চাই। আমি চাই, এমন একটি সমাজব্যবস্থায় আমার সন্তান বেড়ে উঠবে, যেখানে তাকে নারী বলে অতিরিক্ত কোনো চাপের মুখে পড়তে হবে না, কিংবা কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। সে একজন মানুষ হিসেবেই বেড়ে উঠবে। নারী হিসেবে আলাদাভাবে চলার প্রথা থেকে বের হওয়া জরুরি।

ছেলেদের ওপর কেন এত নির্ভরশীলতা? কারণ আমাদের রাষ্ট্র বয়স্কদের দায়িত্ব নেয় না। নামমাত্র একটি ভাতা দেওয়া হয়, যেটা দেওয়া না দেওয়া একই। এ কারণে মানুষ চিন্তা করে, আমার ছেলেকে একটা যন্ত্রের মতো তৈরি করব, যে আমার জন্য মানিমেকিং পারসন হবে। এটা তো ছেলেটার জন্যও একটা প্রতিবন্ধকতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এটা ছেলেদের জন্যও অতিরিক্ত চাপ। কেন তাকে এই চাপ নিয়ে বেড়ে উঠতে হবে? তার কেন নিজের স্বাধীনতা থাকবে না? তার কেন সবার দায়িত্ব নিতে হবে? কেন সমাজে এমন ব্যবস্থা নেই, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মতো করে কাজ করবে, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা থাকবে, বার্ধক্যের সময় পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সুবিধা থাকবে? যেন কারো ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়। আমাদের মানসিক পরিবর্তন তো জরুরিই, সঙ্গে আইনগত কিছু সংস্কারও দরকার।

আমরা সবচেয়ে বেশি ভুগি নিরাপত্তাহীনতায়। একটা বাচ্চা মেয়ে তার বাড়িতেও নিরাপদ না, কর্মক্ষেত্র তো পরের ব্যাপার। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি হেনস্তার শিকার হয় পরিবারের মানুষের দ্বারা। এটা কেন হয়? কারণ আমরা সেই নিরাপত্তা দিতে পারি না। সুতরাং ঘর থেকে কর্মস্থল- সবখানেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়। রাস্তায় হাঁটা যায় না। সন্ধ্যার পর কোনো মেয়েকে বাইরে দেখলে বলা হয়, বের হয়েছ কেন? রাস্তাটা তো সবার। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের মানসিকতা যেমন পরিবর্তন করতে হবে, তেমনি কিছু আইনও প্রয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্র যখন প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তখন আর কেউ কাউকে হয়রানি করার সাহস পাবে না।

উত্তরাধিকার আইন নিয়ে আমি অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। যখন এই আইন করা হয়েছিল, তখন বলা হয়েছে, ভাইয়ের অর্ধেকের চেয়ে কম বোনকে দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ অর্ধেকের কম বোনকে দেওয়া যাবেই না। এই আইন যখন করা হয়েছে, তখন মেয়েদের জীবিত জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হতো, কবর দেওয়া হতো! সেই অন্ধকার যুগে এ রকম নিয়ম বা আইন করা অনেক প্রগতিশীল চিন্তা ছিল। সে আইনে এটাও উল্লেখ আছে যে বাবা চাইলে ছেলে-মেয়েকে সমপরিমাণ সম্পত্তি দিতে পারবে। কিন্তু এ আইন সময়ের সঙ্গে আর পরিবর্তন করা হয়নি। অনেক আইন সংস্কার করা হয়েছে। যখনই উত্তরাধিকার আইনের প্রসঙ্গ আসে, নারীদের অধিকারের কথা আসে, নানাভাবে সেটা এড়িয়ে যাওয়া হয়। আইন বিভাগে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অবশ্যই এ নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

নারীদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন জরুরি। এই মানসিকতা গড়ে উঠেছে আমাদের সমাজব্যবস্থার কারণে। নারীরা নিজেদের উন্নতি চাইতে পারে না, কারণ সেটা তাদের শেখানোই হয় না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার, বিশেষ করে মা। আমি নিজেকে দিয়েই এটা বিশ্বাস করি। আমার মা অনেক কিছুতে আমার জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারেননি। আমার মেয়েকে আমি যা বলতে পারি, সেটা আমার মা আমাকে বলতে পারেননি। তিনি অনেক কিছুতে আমাকে বাধা দিয়েছেন। আমি কিন্তু সেটা করছি না। আমার মেয়ে যেভাবে বড় হচ্ছে, সেটা ওর জীবনে একটা প্রভাব ফেলবে। তাই আমার মনে হয়, প্রত্যেকে যদি সচেতনভাবে চেষ্টা করে, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব।

শিশুদের মানবিক বিকাশের দিকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই জরুরি পারিবারিক বন্ধন। পরিবার থেকে যদি আদর-ভালোবাসা আর সুশিক্ষা পায়, সেটা পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলবে। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার দিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রেও পরিবারের সংস্পর্শ জরুরি। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ সহজেই যেকোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, বলছি না সব সময়, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমনটা হয়। ঐশী নামের একটি মেয়ে নিজের মা-বাবাকে মেরে ফেলেছিল, ওই ঘটনায় আমি প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম। এটাও সম্ভব! সুতরাং পারিবারিক বন্ধনের পাশাপাশি মা-বাবার সৎ থাকাও জরুরি। ছেলে-মেয়ে যা চাইবে, তা-ই দিয়ে দেওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে। পৃথিবীতে কোনো কিছুই সহজলভ্য নয়- এই বোধটা তার মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। সব কিছু তাকে অর্জন করেই নিতে হবে। এ ছাড়া শিশুকে খেলার মাঠে নিয়ে যাওয়া, গ্রামে নিয়ে যাওয়া, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া- এসব চর্চা রাখতে হবে। প্রকৃতির কাছে, পশু-পাখির কাছাকাছি থাকতে পারলে বাচ্চাদের মন সুন্দর হবে, উদার হবে।

আমি তো আইনি লড়াই করে আমার বাচ্চার অভিভাবকত্ব পেয়েছি। এ বিষয়ে আমাদের যে আইন আছে, সেটা অনুযায়ী বাচ্চার ন্যাচারাল গার্ডিয়ান সব সময় বাবা হবে। বাবার পরিবর্তে হবে দাদা, চাচা কিংবা মামা। কিন্তু অনেক ঘোরপ্যাঁচ করে আসতে হয় মায়ের কাছে। একজন মা সন্তানের অভিভাবকত্ব চাইলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। আমি চাই, বাবার মতো মা-ও যেন বাচ্চার ন্যাচারাল গার্ডিয়ান হয়। এটা নিয়ে অনেক আইনজীবী কাজ করছেন, এটা আশার কথা।

অনুলিখন : কামরুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights