পোশাক খাতে অস্থিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি ঘিরে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গতকালও রাজধানীর মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কালিয়াকৈরে ১২ কারখানা বন্ধ ও আশুলিয়ায় ৩০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পোশাকশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, ইউরোপে আন্দোলন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপের সঙ্গে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে রপ্তানি ও ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ হলে ক্ষতি আরও বাড়বে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের দাবি মজুরি বাড়ানো, মজুরি বোর্ড গঠন হলে আন্দোলন কমে যাবে। সরকার বলছে, শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠন করা হচ্ছে আজ।

গতকালও রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক আন্দোলন দেখা গেছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সকাল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মিরপুর এলাকা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে সরে যাওয়ার পর মিরপুর-১ নম্বরের মাজার সংলগ্ন বাজার ও মার্কেট এলাকায় ভাঙচুর চালিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় হিমালয় গার্মেন্টস ও বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষের পাশাপাশি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, যারা এসব ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, তাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলাধীন পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। এ সময় মহাসড়কের ওপর মাটি ভর্তি বস্তা ও কাঠ বাঁশ ফেলে আগুন ধরিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সড়কের কয়েক কিলোমিটার অংশ যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিক বিক্ষোভে ১২টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন এসব তথ্য জানান।

সাভার প্রতিনিধি জানান, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল আশুলিয়ার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করে। আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার, আমতলা, নয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সকালে নাঈম নিটওয়্যারের শ্রমিকরা প্রথমে কারখানার ভিতরে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়কে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আশপাশের কয়েকটি কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টস, এআর জিন্স ও সিডব্লিউএসহ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে শিল্প পুলিশের এক সদস্য আহত হয়েছেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ৩০ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের একজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়সাল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের আন্দোলনের মাঝে ঘটনাস্থল থেকে হাতবোমা সদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। কে বা কারা এই বস্তুগুলো সেখানে বহন করে এনেছে বা রেখে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আজ নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আন্দোলনে থাকার কোনো কারণ নেই। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দও শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি মেনে নিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। গতকাল রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন ও বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ভাঙচুর বা কারখানা বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। এতে গার্মেন্টস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করলেও বাইরে থেকে কিছু লোক এসে শ্রমিকদের উত্তেজিত করছে। ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন এবং চলমান শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে আমাদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আমাদের সব দলীয় সভাপতি, সংসদ সদস্যসহ জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে রাজপথে যে অসন্তোষ, আন্দোলন ও অবরোধ চলছে, তা নিরসনে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমাদের জোটের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিনিধি দিচ্ছি। মজুরি বোর্ড গঠিত হলে বর্তমানে চলমান আন্দোলন ও অসন্তোষ কমে আসবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শুধু পোশাকশিল্পের মালিকরা নন, সরকারও শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে উদ্বিগ্ন। সরকার ও মালিক পক্ষ যখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তখন কার স্বার্থে এবং কারা আন্দোলন করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এদিকে, শ্রমিকদের বিক্ষোভে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরুদ্ধ ছিল ৬ ঘণ্টা। পরে রাত ৮টায় ফের যান চলাচল শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights