বর্ষার আগে ফের খোঁড়াখুঁড়ি

রফিকুল ইসলাম রনি

বর্ষার আগমুহূর্তে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। কোথাও রাস্তা ও ড্রেন সংস্কারের কাজ করতে লম্বা সময় ধরে রাস্তা বন্ধ, আবার কোথাও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির ফলে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কাদাপানিতে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে মহানগরের অনেক সড়ক। চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। রাজধানীর পল্টন, কাকরাইল, সেগুনবাগিচা, ধানমন্ডি, জিগাতলা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, মিরবাগ, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বারিধারা, ভাটারা, খিলক্ষেত, তেজগাঁও, দক্ষিণখান, উত্তরখান এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে রাস্তা খুঁড়ে রেখেছে। সেই সঙ্গে কাজ করছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এক সংস্থা রাস্তা মেরামত করে যাওয়ার কয়েক দিন পরই অন্য একটি সংস্থা নতুন করে গর্ত খুঁড়ছে। এ সংস্থাগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয় নেই। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রামপুরা থেকে হাতিরঝিল চলাচলের নতুন রাস্তায় ছয় মাস ধরে ড্রেনের লাইনের কাজ করা হচ্ছে। সে কাজ এখনো শেষ হয়নি। মিরবাগ মোড় থেকে মিরেরটেক রাস্তায় ড্রেনের কাজ করছে উত্তর সিটি করপোরেশন। গতকাল সকালে এ রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছিল স্কুলছাত্রী ফাহিমা খাতুন।

কাদায় তার স্কুল ড্রেস নষ্ট হয়। ক্ষোভের সঙ্গে ফাহিমা বলে, ‘ভেকুর ড্রাইভার খুব খারাপ। এমনিতে রাস্তায় হাঁটা কঠিন, তারপরও কাদামাটি ভেকুতে তোলার সময় আমার ড্রেস নষ্ট হয়ে গেল। শুকনো মৌসুমে কাজ করলে তো কারও কোনো সমস্যা হতো না। এখন মেঘ ডাকলেই ভয় লাগে, বৃষ্টির পানিতে গর্ত ভরাট হলে বোঝা যায় না কোথায় খাদ আর কোথায় ভালো।’ মিরবাগ দারুল আমান জামে মসজিদের পাশেই নজরুল ইসলামের সবজি ও মুদি দোকান।

গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি খোঁড়াখুঁড়ির ফলে তাঁর দোকানে আর আগের মতো কেনাবেচা নেই। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে এই রাস্তার কংক্রিটের কাজ শেষ হয়েছে। এখন আবার ওয়াসা পানির লাইনের জন্য খুঁড়ছে। সেবা সংস্থার সমন্বয় না থাকায় মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে।’

রাজধানীর মধুবাগ এলাকার উলন রোডসহ কয়েকটি সড়কে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। ড্রেনেজ, বিদ্যুৎসহ কয়েকটি সংস্থা রাস্তা কেটে সংস্কার কাজ করছে। দীর্ঘদিন কাজ চলতে থাকায় এ এলাকার মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। কোনো গাড়ি বা রিকশা চলাচল করতে পারছে না। একই সঙ্গে হেঁটে চলাও দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর পুরানা পল্টন থেকে কাকরাইল পর্যন্ত সড়কটির একপাশ খুঁড়ে মাটির নিচ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার বসানোর কাজ করছে ডিপিডিসি। ব্যস্ত এ সড়কের সঙ্গে যুক্ত আশপাশের বেশ কিছু সংযোগ সড়ক। খোঁড়াখুঁড়িতে এসব সংযোগ সড়ক মুখ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়ে অচলাবস্থা। একইভাবে সেগুনবাগিচার বিভিন্ন রাস্তায় চলছে ডিপিডিসির কাজ। সরু রাস্তা বন্ধ করে কাজ করার কারণে অন্য রাস্তায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সেগুনবাগিচার সড়কটি কিছুদিন আগে পিচঢালাই করা হয়েছিল। এরপর ডিপিডিসির কাজ শুরু হয়েছে। ধানমন্ডি জিগাতলা থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাত কেটে করা হচ্ছে উন্নয়ন কাজ। উন্নয়নের নামে সমন্বহীনভাবে কাজ করার ফলে মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। খিলক্ষেতের রাস্তায় অধিকাংশ সময়ই চলে খোঁড়াখুঁড়ি। কখনো কখনো বন্ধও থাকে। রাস্তার ভোগান্তিকে যেন নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন এখানকার বাসিন্দারা।

মিনহাজ নামে স্থায়ী বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, ‘এ রাস্তায় সারা বছরই কোনো না কোনো সংস্কার কাজ চলে। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ঘণ্টার পর পর ঘণ্টা যানবাহনগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। খিলক্ষেতে কখনো ড্রেন ঠিক করে, আবার কখনো ইউটিলিটি লাইন, রাস্তা মেরামতের নাম করে লম্বা সময় ধরে ভোগান্তি চলে। এসব দেখার যেন কেউ নেই!’

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, বেশির ভাগ সড়কেই কাটাকাটির কারণে চলতে কষ্ট হয়। ঢাকা শহরে সেবাদাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের। অল্প একটু রাস্তা পার হতে আধা ঘণ্টা সময় লেগে যায়। মাঝেমধ্যে আরও বেশিও।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নাজমুল হক বলেন, কাছাকাছি এলাকায় এত সড়কে একসঙ্গে কাটাকাটি ও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন কাজ চলতে থাকায় এ এলাকার মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কোনো গাড়ি বা রিকশা চলাচল করতে পারছে না। একই সঙ্গে হেঁটে চলাও দায়।

রাজধানীর খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘উন্নয়ন কাজে কিছু ভোগান্তি স্বাভাবিক। তবে কাজ দীর্ঘায়িত হলে মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়।’ এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, ‘উন্নয়ন কাজ চলমান রাখতে হবে। কিন্তু মানুষের যেন ভোগান্তি না বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেবা সংস্থাগুলোকে সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights