বার্তা নিয়ে এলেন সার্জিও গোর

মাসুদ করিম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর বাংলাদেশ সফরের শুরুতেই বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণসতর্কতা কমানোর সুখবর দিলেন। গতকাল সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেন, ‘আজ সন্ধ্যায় আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে জানিয়েছি যে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট মাঠপর্যায়ের স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েছে এবং বাংলাদেশকে ভ্রমণের জন্য অধিকতর নিরাপদ বলে মনে করেছে। সেই অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক ভ্রমণ লেভেল তিন থেকে কমিয়ে লেবেল দুইয়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ রয়েছে এবং সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। দারুন খবর।’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সার্জিও গোর এই বার্তা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোরের ওই বার্তার ব্যাখ্যায় গতকাল বলেছে, ‘ভ্রমণসতর্কতার এই উন্নতি বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন। গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের ইতিবাচক ধারাকেও তুলে ধরেছে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সরকার এই উন্নতিকে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক জনসংযোগের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর পৃথক এক এক্স বার্তায় সার্জিও গোর লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে প্রথম সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আলোচনা করেছি। অনেকগুলো ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।’

সার্জিও গোর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক দূতই নন; তিনি ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। ফলে সার্জিও গোরের সঙ্গে আলোচনায় শেখ হাসিনা তথা ভারত প্রসঙ্গ আলোচনা হয়েছে কি না, সেদিকে বেশ কৌতূহল রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠক যেখানে দুই পক্ষের অনেক কর্মকর্তাই উপস্থিত ছিলেন, সেখানে এই প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে সার্জিও গোর একটি ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে অংশ নেন। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সার্জিও গোর ও ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে এসব প্রসঙ্গ আলোচনা হয়েছে কিনা জানি না।’ তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাফ জানিয়েছেন যে ভারত প্রসঙ্গে কোনো আলোচনাই হয়নি।

এদিকে ভারতের মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেবে না দিল্লি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসাবে সেপ্টেম্বরের ১৩-১৪ তারিখে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ কর্মসূচিতে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই সময়ে গোরের এবারের সফরকে অনেকে আবার রুটিন বলছেন। কারণ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা এবং নেপালও সফর করেছেন।

সার্জিও গোরের এই সফরের ধরন কী, জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটি একটি পরিচিতিমূলক সফর। বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করার বিষয় নিশ্চয়ই আলোচনা হবে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজ সৌজন্য সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ শনিবার সার্জিও গোর সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকের আগে তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তাগুলো প্রকাশ্যে বলেছেন। বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কারণ ব্যাখ্যা করে ঢাকার এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। বর্তমানে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বাংলাদেশের, যা অনেককে এ দেশের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী করছে। বাংলাদেশে সুশীল সমাজ এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা এই সফরের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। রোহিঙ্গাশিবিরও তিনি পরিদর্শন করেছেন। রোহিঙ্গাদের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র করে থাকে। তবে অন্যরা কতটা সহায়তা করছে সেই বিষয়েও গোর খোঁজ নিয়েছেন।

টু প্লাস টু বৈঠক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ পক্ষে এবং সার্জিও গোর ও ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে টু প্লাস টু বৈঠকে অংশ নেন। এতে রুটিন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানা যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের রাশিয়া সফরের পর এমন সব বিষয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অতিরিক্ত মাখামাখি যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করে না। বিশেষ করে সামরিক সহযোগিতা, সমরাস্ত্র ক্রয় এবং কৌশলগত ও বৈশ্বিক সহযোগিতার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রু কুঁচকে পর্যবেক্ষণ করে। ব্রিকস সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের সদস্য পদের আবেদনের প্রতি চীন ও রাশিয়ার সমর্থনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র নিবিড় পর্যবেক্ষণ করবে বলে অনুমেয়। তা ছাড়া চীন থেকে বাংলাদেশের সমরাস্ত্র ক্রয় বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা কতদূর এগোলো নিশ্চয় অনুধাবনের চেষ্টা থাকবে ওয়াশিংটনের। বাংলাদেশ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্রের দাম বেশি। যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন। ফলে চীনের সঙ্গে সখ্য এই ক্ষেত্রে অনিবার্য। এমন বাস্তবতায় চীনকে ঠেকাতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে বাংলাদেশে সমরাস্ত্র বিক্রিতে উৎসাহিত করে যুক্তরাষ্ট্র। ইদানীং তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি সমরাস্ত্র ক্রয়ে বহুমুখীকরণের বাংলাদেশের নীতির প্রকাশ বলে বিবেচনা করা যায়।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : কূটনৈতিক সূত্রমতে, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অনেকগুলো বিষয় আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় সবার আগে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি)- পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই দেশের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তিটি সই করে। বাংলাদেশে অনেকে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একতরফা চুক্তি বলে অভিহিত করেন। যদিও গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক পূর্বমুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার কোন বাস্তবতায় তড়িঘড়ি এই চুক্তি সই করেছে তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা চোখে পড়েনি।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘এআরটি বাস্তবায়নের জন্য সার্জিও গোর তাগিদ দিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে যেমন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি কিংবা খাদ্য যেমন গম ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন পক্ষ তাদের খাদ্যপণ্যের গুণগতমান অনেক ভালো বলে উল্লেখ করে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিষয়টি জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রতি আলোকপাত করেন সার্জিও গোর। তিনি মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে তাদের নীতির প্রতি আলোকপাত করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবারও অভিনন্দন জানান সার্জিও গোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights