বিলুপ্তির পথে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প: অস্তিত্ব সংকটে কারিগররা

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধ ঃ

আধুনিকতার কবলে পড়ে এবং প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক আধিপত্যে দিনাজপুরের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। কাঁচামালের উচ্চমূল্য, শ্রম অনুযায়ী ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং চাহিদার ঘাটতিতে পৈতৃক এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন স্থানীয় কারিগররা। সম্প্রতি দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ হাটসহ বিভিন্ন গ্রামীণ বাজার ঘুরে এই শিল্পের নাজুক চিত্র ফুটে উঠেছে।
এক সময় গ্রামীণ জনপদে কুলা, ডালা, চালুন, ঝুড়ি, মোড়া এবং মাছ ধরার সরঞ্জামের (ডার্কি, খলই) ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বর্তমানে তা নিম্নমুখী। শিল্পের এই ধসের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে: সস্তা ও টেকসই হওয়ায় সাধারণ মানুষ বাঁশের পণ্যের বদলে প্লাস্টিক সামগ্রীর দিকে ঝুঁকছে। বন উজাড় ও অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের ফলে স্থানীয়ভাবে বাঁশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দূর থেকে চড়া দামে বাঁশ কিনতে হচ্ছে। একটি পণ্য তৈরিতে যে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, বিক্রয়মূল্য তার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর ধরে এই পেশায় জড়িত কারিগরদের কন্ঠে ফুটে উঠেছে কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। ইশানিয়া গ্রামের কারিগর আমজাদ হোসেন ও লক্ষ্মীপুরের ফটিক চন্দ্র রায় জানান, এটি তাদের বংশগত পেশা বলেই তারা এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। কিন্তু বর্তমান বাজারে খাজনা ও সংসার খরচ মেটানোই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
কারিগর রতন পাল (৫০) আক্ষেপ করে বলেন, আগে বাঁশের কাজ করে সংসার ভালোই চলতো, এখন আর চলে না। এতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই দেখে ছেলেমেয়েরা এই কাজ শিখতে চায় না। অনেকে বাধ্য হয়ে দিনমজুর বা ইজিবাইক চালকের পেশা বেছে নিচ্ছেন।
আরেক কারিগর শিবচরণ জানান, লাভের আশা ছেড়ে কেবল জাত ব্যবসা রক্ষার তাগিদে তারা কুলা, ডালি ও পাখা তৈরি করে হাটে হাটে ঘুরছেন।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন, বাঁশ শিল্প কেবল অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দিনাজপুরের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়ন জরুরি। তিনি বলেন, ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে ১ থেকে ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণের সুবিধা রয়েছে। আগ্রহী কারিগরদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই শিল্পের সংকট মোকাবিলায় বিসিক তাদের তদারকি বৃদ্ধি করবে।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক ডিজাইনের সংমিশ্রণ ঘটানো সম্ভব হলে দিনাজপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায়, পরিবেশবান্ধব এই গ্রামীণ শিল্পটি অচিরেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বার্তা প্রেরক ঃ আব্দুস সালাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights