ব্যবসাসফল সিনেমা শূন্যের কোঠায়

আলাউদ্দীন মাজিদ
কমপক্ষে আশির দশক পর্যন্ত প্রতি মাসে সিনেমা মুক্তির পরিমাণ ছিল শতাধিক। এর মধ্যে ৯৫ ভাগই ছিল বাম্পার, সুপার কিংবা হিট। এতে প্রদর্শক, প্রযোজক এবং দর্শক-তিন পক্ষের মুখেই ছিল সন্তুষ্টির ছাপ। কিন্তু নব্বই দশক থেকে নানা কারণে চলচ্চিত্রজগতে নেমে আসে চরম খরা। মানসম্মত ও পর্যাপ্ত সিনেমা নেই, দর্শক নেই, সিনেমা ও সিনেমা হলের ব্যবসা পড়েছে চরম লোকসানের কবলে। এতে নব্বই দশক পর্যন্ত দেশে থাকা প্রায় সাড়ে ১৩ শ সিনেমা হলের সংখ্যা কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৫০টিরও নিচে। অনবরত কমছে সিনেমা মুক্তি। গত বছর মুক্তি পেয়েছিল ৪৬টি সিনেমা। চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে মাত্র ২৫টি। এর মধ্যে ব্যবসাসফল হয়েছে মাত্র একটি। সেটি হলো তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। আর বাকি ২৪টির ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফ্লপ সিনেমাগুলোর মধ্যে সিনেমা হল মালিকদের কাছে আশাজাগানিয়া নায়ক বলে খ্যাত শাকিব খানের ‘প্রিন্স’ ও ‘রকস্টার’ও রয়েছে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার উইকিপিডয়ার সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ সিনেমার আয় ছিল ২০ কোটি টাকা। অন্য এক সূত্রের দাবি, এ আয়ের পরিমাণ ২১ কোটি ৪ লাখ টাকা। চলতি বছর মুক্তি পাওয়া শাকিব খানের সিনেমাসহ অন্য সিনেমাগুলোর আয় এর ধারেকাছেও নেই। মানে বছরের দুই ঈদে যে শাকিব খানের সিনেমা দিয়ে সিনেমা হল মালিকরা সারা বছরের আয় ঘরে তুলে আনতেন সেই শাকিব খানের সিনেমাও এখন আর দর্শক তেমনভাবে গ্রহণ করছেন না। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলছেন, এর কারণ শাকিবের অভিনয় একই বৃত্তে বন্দি হয়ে আছে। অন্যদিকে চলতি বছর ‘রাক্ষস’, ‘দম’, ‘প্রেসার কুকার’র মতো সিনেমা নিয়ে দর্শক-প্রদর্শকদের ব্যাপক প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাতেও গুড়েবালি। ‘রইদ’ সিনেমাটি ব্যবসা করতে না পারলেও দেশবিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত দেশের সিনেপ্লেক্সগুলো আমদানি করেছে ৬৪টি ইংরেজি সিনেমা। ব্যবসাসফল সিনেমা শূন্যের কোঠায়এর মধ্যে শুধু ‘স্পাইডার ম্যান’ সিনেমাটি প্রত্যাশিত ব্যবসা করেছে। বাকিগুলো ফ্লপের খাতায় নাম লিখিয়েছে। এ অবস্থায় সিনেমা হল মালিক সমিতি মানে প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়েছি-সিনেমা হল বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত সিনেমা দরকার।’ তিনি আশ্বস্ত করেছেন সিনেমা নির্মাণে প্রযোজকদের ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সার্ভার, ইটিকেটিং ব্যবস্থা চালুসহ সিনেমা হল এবং সিনেপ্লেক্স নির্মাণ ও উন্নয়নে ঋণ দেবে সরকার। সেই সঙ্গে দেশের প্রতি জেলায় তথ্য কমপ্লেক্সে সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে দেশের ১৮টি জেলায় এ সিনেপ্লেক্স নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। তা ছাড়া সিনেমার অভাব পূরণে সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে সিনেমা আমদানির জন্য প্রদর্শকদের আবেদন সরকার বিবেচনা করছে বলেও জানান সভাপতি উজ্জ্বল। এদিকে ঢাকার লায়ন সিনেমাসের কর্ণধার মির্জা খালেক বলেন, ‘যেহেতু দেশীয় সিনেমার অভাব, তাই সে অভাব পূরণে সরকার সিনেমা আমদানি করার অনুমতি দিলে আবার সিনেমা হল ও সিনেমার ব্যবসা ঘুড়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া সিনেমা শিল্পের স্টেকহোল্ডারদের সরকার যদি ডেকে জানতে চায়-এ শিল্পটি কী অবস্থায় রয়েছে তাহলে আমরা আস্বস্ত হতে পারতাম।’ মুন্সিগঞ্জের পান্না প্রেক্ষাগৃহের মালিক আসগর পান্না বলেন, ‘সিনেমার অভাবে দর্শক ধরে রাখা যায় না। দ্রুত উপমহাদেশীয় সিনেমা আমদানি, যৌথ প্রযোজনা নীতিমালার সহজীকরণ এবং সিনেমা সংস্কারে আমদানি করা দ্রব্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হলে আপাতত রক্ষা পাওয়া যাবে।’ যশোর মণিহারের মালিক জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘সিনেমা খরায় ঈদের সিনেমা দিয়ে টুকটাক ব্যবসা করতাম। কিন্তু এ বছরের ঈদেও সিনেমা ব্যবসা করেনি। এভাবে আর চালাতে পারছি না। কর্মচারীদের বেতন বাকি থাকছে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে পারছি না। হল খোলা থাকলে একজন নিয়ে সিনেমা চালালে যে বিল আসে, এক হাজার লোক নিয়ে চালালেও সেই বিল আসে। দেশীয় নতুন ভালো সিনেমা বা ভারতীয় সিনেমা আমদানি করার আশ্বাস না পেলে সিনেমা হল চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।’ দিনাজপুরের মডার্ন সিনেমা হলের মালিক এস এম পারভেজ বলেন, ‘হল চালানোর মতো সিনেমাই তো নেই। দিনে চারটা শো চলার কথা থাকলেও এক-দুটির বেশি চলে না। তা-ও দর্শক খরায় মাঝে মাঝে বন্ধ থাকে। এতে খরচও ওঠে না। আমাদের অন্য ব্যবসা আছে। বছরের পর বছর সেখান থেকে ভর্তুকি দিয়ে চালাচ্ছি। তাই বন্ধের সিদ্ধান্ত নিই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights