ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দুঃস্বপ্ন, আনচেলত্তির চরম ব্যর্থতার নেপথ্যে কি?

অনলাইন ডেস্ক

উত্তর আমেরিকার মাটিতে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন নিয়ে এসে শেষ ষোলোতেই থমকে গেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ডার্ক হর্স নরওয়ের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর সেলেসাওদের অন্দরে এখন শুরু হয়েছে তুমুল কাটাছেঁড়া। আরলিং হালান্ডের গোলবন্যার সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া ব্রাজিলের এই বিদায় আকস্মিক মনে হলেও পুরো টুর্নামেন্টে তাদের পারফরম্যান্স ছিল ছন্নছাড়া। কেবল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভরসা করে চলা একটি বুড়িয়ে যাওয়া এবং সমন্বয়হীন দল নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশাও করা কঠিন ছিল। নিউজার্সির মাঠে এই বিপর্যয়ের পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন এক বছর আগে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়া অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তার ভবিষ্যৎ এখন সুতোয় ঝুলছে, অথচ আনচেলত্তি নিজে একে নতুন এক চক্রের শুরু বলে দাবি করছেন। তবে অতীত ঘাটলে দেখা যায়, দল নির্বাচন থেকে শুরু করে মাঠের রণকৌশল; সবখানেই বড় বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই মাস্টারমাইন্ড।

ব্রাজিলের এই ভরাডুবির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আনচেলত্তির দল নির্বাচন এবং অতিরিক্ত অভিজ্ঞতার ওপর অতি-নির্ভরশীলতা। বিকল্প তরুণ খেলোয়াড় গড়ে না ওঠার অজুহাতে তিনি বছরের পর বছর ধরে খেলে আসা একঝাঁক বয়োবৃদ্ধ ফুটবলারকে স্কোয়াডে রেখেছিলেন। দলে থাকা তিন গোলরক্ষকের বয়স ছিল যথাক্রমে ৩৩, ৩২ ও ৩৮ বছর। রক্ষণভাগের গড় বয়স ছিল ৩১, যেখানে দানিলো বা অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো ফুটবলাররা এক দশক আগের ফুটবলকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। মাঝমাঠে ৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরো এবং ৩২ বছর বয়সী ফ্যাবিনিওকে অতিরিক্ত খেলানো হয়েছে। বোর্নমাউথের তরুণ রায়ান বা বোটফোগোর দানিলোর মতো গুটি কয়েক উদীয়মান মুখ আশার আলো দেখালেও আনচেলত্তি নিজে বিদায়ের পর স্বীকার করেছেন যে দলে এখন নতুন রক্তের বড্ড অভাব।

সবচেয়ে বড় জুয়াটা আনচেলত্তি খেলেছিলেন নেইমারকে নিয়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর ইনজুরির কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে দূরে থাকা ৩৪ বছর বয়সী এই তারকাকে জনমতের চাপে দলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়। বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে কাফ ইনজুরিতে পড়ে নেইমার প্রথম দুই ম্যাচ মিস করেন এবং স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে মাত্র ১৪ মিনিটের জন্য মাঠে নামেন। মায়ামির সেই ম্যাচে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক প্রীতি ম্যাচ খেলতে নেমেছেন, দেশের ত্রাতা হিসেবে তার রূপটা ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। নকআউট পর্বে জাপানের বিপক্ষে তাকে খেলানোই হয়নি, আর নরওয়ের বিরুদ্ধে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে বদলি হিসেবে নামলেও পেনাল্টি থেকে একটি সান্ত্বনা সূচক গোল করা ছাড়া তিনি ছিলেন পুরোপুরি নিষ্প্রভ। সম্ভবত এটাই ছিল ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের শেষ ম্যাচ।

নেইমারকে দলে নেওয়ার জন্য চেলসির ২৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড জোয়াও পেদ্রোকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়াটাই ছিল আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় ভুল। চেলসির হয়ে এক মৌসুমে ২৯টি গোল ও অ্যাসিস্ট করা পেদ্রোকে যখন দলে রাখা হয়নি, তখন স্বয়ং কোচও মেনে নিয়েছিলেন যে পেদ্রোর দলে থাকার যোগ্যতা ছিল। দলের এই করুণ বিদায়ের পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, এই বিপর্যয়ের শুরু বেঞ্চের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে। পেদ্রোর মতো ফর্মে থাকা স্ট্রাইকারকে বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সব মিলিয়ে, ভুল রণকৌশল, ইনজুরি আর ভুল দল নির্বাচনের মাশুল দিয়ে আরও একবার বিশ্বকাপ থেকে শূন্য হাতে এবং চরম অপমান নিয়ে বিদায় নিতে হলো সাম্বার দেশকে।

সূত্র: গোল ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights