ব্রাজিল থেকে ‌‘পালানোর অভিযোগ’ নিয়ে মুখ খুললেন বলসোনারো

অনলাইন ডেস্ক
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মিয়ামিতে পৌঁছে দেশত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন পরাজিত ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। দেশ ছেড়ে পালানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি দাবি করেছেন, নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার ছিল না। বরং ব্রাজিলের স্বার্থেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাজিল ছাড়ার পর প্রথমবারের মতো দেওয়া এক বিবৃতিতে ফ্লাভিও বলেন, ‘আমি ব্রাজিল থেকে পালিয়ে যাইনি; ব্রাজিলের স্বার্থেই দেশ ছেড়েছি।’

একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এর আগে তার পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ফ্লাভিও ও তার পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেয়। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন তিনি। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ফ্লাভিওকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ব্রাজিলের পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ফ্লাভিওর গোপনে দেশত্যাগের সমালোচনা করেছেন। লুলা বলেন, ‘যাদের লুকানোর কিছু নেই, তাদের ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।’

রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি
ফ্লোরিডায় ফ্লাভিওর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার অবস্থান নিয়ে কয়েক দিনের অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে। এর আগে তিনি আর্জেন্টিনায় গেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। পরে মঙ্গলবারই তার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর খবরও ছড়িয়ে পড়ে।

নিজের বিবৃতিতে ফ্লাভিও আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং মার্কিন জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন। তার ভাষ্য, ব্যতিক্রমী শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছেন, যাতে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী নেতা হয়ে উঠতে পারেন।

ফ্লাভিও নিজেকে অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার বলে দাবি করেছেন। পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘ বিবৃতিতে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও আবার তুলে ধরেন এই ডানপন্থি নেতা। তার দাবি, নির্বাচনের ফলাফল গাণিতিকভাবে অসম্ভব।

বুধবার এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, এ বিষয়ে জড়াতে চান না। তবে তার মতে, ব্রাজিলের নির্বাচনটি ছিল ‘খুব অদ্ভুত’। ফ্লাভিও ও তার পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত অন্যায্য আচরণ করা হয়েছে বলেও মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় ফ্লাভিও জয়ী হলেও দ্বিতীয় দফায় বামপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী লুলা ৪০ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পান। ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সমর্থন লুলার দিকে যাওয়াকে এই ফলাফলের কারণ হিসেবে দেখা হয়।

ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনি আদালতের প্রধানও নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করেন। উল্লেখ্য, ওই বিচারককে নিয়োগ দিয়েছিলেন ফ্লাভিওর বাবা ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো।

গোপনীয়তা ঘিরে জল্পনা, পরে মিলল মিয়ামিতে পৌঁছানোর তথ্য
ফ্লাভিওর অবস্থান নিয়ে প্রথম জল্পনা তৈরি হয় আর্জেন্টিনার একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের পর। সেখানে বলা হয়েছিল, স্থলপথে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সীমান্ত পেরিয়ে একটি ব্যক্তিগত বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন তিনি।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় ব্রাজিলের পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে সীমান্ত পারাপারের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হলেও ফ্লাভিওর দেশত্যাগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর্জেন্টিনার কর্মকর্তারাও তার সীমান্ত অতিক্রমের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকার কথা জানাননি।

নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় লুলার কাছে অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর ফ্লাভিও ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রয়েছেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে তার পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মঙ্গলবার পাসপোর্ট জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষ সেটি বাতিল করে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ফ্লাভিওর দেশত্যাগের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। তার আইনজীবীরাও জানান, তিনি কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবিসিসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে বিভিন্ন সূত্র জানায়, ফ্লাভিও যুক্তরাষ্ট্রের পথে রয়েছেন। পরে তার ছোট ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ এক চাচাতো ভাই বিবিসি ব্রাজিলকে নিশ্চিত করেন, ফ্লাভিও মিয়ামিতে পৌঁছেছেন। এদুয়ার্দোর আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগীও বিবিসি মুন্ডোকে একই তথ্য দেন। তবে ওই সময় ফ্লাভিও বা এদুয়ার্দোর কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এরপর আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে ফ্লাভিও, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে স্থলপথে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন।

বিবিসির যাচাই করা ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১৮ মিনিটে বলসোনারো পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি ব্যক্তিগত বিমান আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো ইগুয়াজু থেকে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে অল্প সময়ের যাত্রাবিরতির পর বিমানটি মিয়ামি-ওপা লকা এক্সিকিউটিভ বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা করে।

স্থানীয় সময় বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার কিছু আগে বিমানটি সেখানে পৌঁছায়। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় ফ্লাভিওকে ঘিরে ধরেন অপেক্ষমাণ আলোকচিত্রীরা। এ সময় তার সহযোগীরা ছাতা দিয়ে তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাই ফ্লাভিওর সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশ করেন এদুয়ার্দো। ছবির অবস্থান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়।

ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত
যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাভিও কত দিন থাকবেন কিংবা শেষ পর্যন্ত কোথায় অবস্থান করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টে তার বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত চলছে।

এর মধ্যে একটি তদন্তে বেসরকারি ব্যাংক ব্যাংকো মাস্টার থেকে প্রায় ৭ কোটি ডলার স্থানান্তরের ঘটনায় সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তার বাবা জইর বলসোনারোকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য ওই অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছিল।

অন্য তদন্তটি অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে। তবে ফ্লাভিও তার বিরুদ্ধে আনা উভয় অভিযোগই অস্বীকার করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights