ব্রাশফায়ারের পর আগুন দেওয়া হয় লাশে

শাহ্ দিদার আলম নবেল, সিলেট

২৬ মে, ১৯৭১। সকাল প্রায় ১০টা। পাকিস্তানি আর্মিরা শান্তি কমিটি গঠনের নামে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা হাইস্কুলে জড়ো করে বিভিন্ন গ্রামের সহজ-সরল নারী-পুরুষদের। পাকসেনারা আগের দিন বাজারে এসে জানিয়ে যায় কেউ যেন কারও ওপর অত্যাচার করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে ‘শান্তি কার্ড’ দেওয়া হবে। স্কুলের অফিস কক্ষে হিন্দুদের, আর ক্লাসরুমগুলোতে মুসলমানদের আলাদা করে রাখা হয়। এরপর ঘটে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক লোককে, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘বুরুঙ্গা গণহত্যা’ নামে পরিচিত। ওই সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বুরুঙ্গা হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক শ্রীনিবাস চক্রবর্তী। শ্রীনিবাস চক্রবর্তী জানান, সে সময় তিনি ছিলেন আঠারো বছরের কলেজপড়ুয়া যুবক। অন্যদের সঙ্গে তাকেও স্কুলের অফিস কক্ষে আলাদা করে রাখা হয়। সেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখে হতবাক হয়ে পড়েন তিনি। নিজে বেঁচে গেলেও পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন তাঁর বাবা ও ছোটভাই।

শ্রীনিবাস বলেন, সেদিন মুসলমানদের নেতৃস্থানীয় ১০-১২ জনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আটক কয়েকজনকে দিয়ে পাক আর্মিরা দড়ি ও কেরোসিন আনায়। এরপর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। একেক দড়ি দিয়ে চার-পাঁচজন করে বেঁধে স্কুলের পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় বুরুঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন চৌধুরী পেছন দিকে লাফ দিয়ে পালাতে চেষ্টা করেন। তখন আর্মিরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করলেও সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। একইভাবে সেদিন রানু মালাকার নামেরও একজন পালাতে সক্ষম হন। শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর সঙ্গে আটক ছিলেন তার বাবা ও ছোটভাই। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শ্রীনিবাস বলেন, ছোট ভাইটি ঘটনার পরিণতি আঁচ করতে পেরে তখন কাতর স্বরে চুপিচুপি বলে, ‘দাদা আমি বুঝি আর মাকে দেখতে পারব না’। ছোট ভাইয়ের এই কথাটা আজও আমাকে বেদনায়ভারাক্রান্ত করে তোলে। তিনি বলেন, প্রায় ১০০ জন হিন্দুকে লাইনে দাঁড় করানো হয়। প্রাণভয়ে সিলেট থেকে পালিয়ে আসা জজকোর্টের উকিল রামরঞ্জন ভট্টাচার্যকে স্কুলের বারান্দায় চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। পরে তাকে চলে যাওয়ার কথা বলে পেছন থেকে গুলি করে মারে পাক আর্মিরা। এরপর লাইন করে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাদের লক্ষ্য করে দুজন পাক আর্মি মেশিনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। তিনি বলেন, আমার দুই হাত বাঁধা ছিল। স্কাউটের ট্রেনিং থাকায় জানতাম কোন পজিশনে থাকলে গুলি কম লাগবে। গুলি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি কাত হয়ে পড়ে গেলাম।

একটা গুলি আমার হাতে লেগে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে পড়ে রইলাম। ব্রাশফায়ারে আহতদের পরে রাইফেল দিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পাক আর্মিরা। আমি তখনো মরার মতো পড়ে থাকায়, আমার দিকে রাইফেল তাক করা হয়নি। পাকসেনাদের বর্বরতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রাক্তন এই শিক্ষক বলেন, সবাই মরে গেছে নিশ্চিত হয়ে স্থানীয় লোকদের দিয়ে লাশের ওপর কেরোসিন ঢালায় পাকিরা। আমার গায়েও কেরোসিনের ছিটে পড়ায় বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি লাইনের শেষ প্রান্তে ছিলাম। আগুন দেওয়ার পর পড়ে থাকা জীবিতরা চিৎকার শুরু করে। তখন পাকসেনারা ফের এসে তাদের গুলি করে। দ্বিতীয়বার যখন আর্মিরা গুলি চালায় তখন দুটি গুলি আমার পিঠ স্পর্শ করে চলে যায়। আগুনে পুড়ে যাব জেনেও আমি প্রায় ১৫ মিনিট মরার মতো পড়ে রইলাম। এরপর পাক আর্মিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে নিশ্চিত হয়ে আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার একটা হাত প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল। পিঠে গুলি লাগায় রক্ত ঝরছিল। অনেক চেষ্টায় হাতের বাঁধন খুলে স্কুলের পেছন দিকে গিয়ে এক বাড়িতে উঠি। এরপর বাড়িতে ফিরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights