ব্রিকস জোট কি ধীরে ধীরে কার্যকর হয়ে উঠছে?

অনলাইন ডেস্ক

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে ব্রিকস জোটের অবস্থান এখন কেবল কোনো সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা বা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতি সম্প্রতি নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন প্রমাণ করে দিয়েছে, উদীয়মান অর্থনীতির এই প্ল্যাটফর্মটি তার প্রাথমিক গণ্ডি পেরিয়ে অত্যন্ত কার্যকর কৌশলগত সংস্থায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত্তি গঠনে ব্রিকস এখন আর কেবল একটি বিতর্ক বা আলোচনার স্থান নয় বরং বিশ্ব কাঠামোর বাস্তব বিকল্প গড়ে তোলার অন্যতম চালিকাশক্তি। বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মতাদর্শগত ফারাক, ভিন্ন আঞ্চলিক স্বার্থ এবং পশ্চিমাদের সাথে বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি দেশই নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে ব্রিকসের ব্যানারে একমত হয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব থেকে রাশিয়ার ওপর আরোপিত অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বয়কট প্রচেষ্টার মধ্যে এই শীর্ষ সম্মেলনটি মস্কোর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মেলনে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক গভীর ও মৌলিক পরিবর্তনের কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু এখন ক্রমান্বয়ে পুরনো পশ্চিমা কেন্দ্রগুলো থেকে নতুন উদীয়মান দেশগুলোর দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি দেখান, গত পাঁচ বছরে বিশ্ব জিডিপি বৃদ্ধির ৪০ শতাংশেরও বেশি এসেছে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো থেকে, যেখানে শিল্পোন্নত জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অবদান ছিল ২৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের এই প্রক্রিয়ায় ব্রিকস এখন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির একটি টেকসই ও স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম কানুনে পরিচালিত হতে রাজি নয়।

সম্মেলনের মূল ভাবনায় এখন আর কেবল সাধারণ সংস্কারের প্রস্তাব শোভা পাচ্ছে না বরং আলোচনা কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন, নতুন ট্রানজিট বা পরিবহন করিডোর, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী অবকাঠামো। বিশেষ করে ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এই বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুই নেতা রাজনীতি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি যৌথ শিল্প কারখানা তৈরি, খনিজ সম্পদ আহরণ এবং শ্রম গতিশীলতার দিকে নজর দিয়েছেন। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘ইনোপ্রম ইন্ডিয়া’ প্রদর্শনীতে দুই দেশের শীর্ষ নেতার যৌথ উপস্থিতি সংকেত দেয় যে, রাশিয়া ও ভারত কেবল তেল বা অস্ত্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিনিময়ের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে।

অর্থনৈতিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক মোড়লের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর এবং ট্রান্স-আর্টিনাল করিডোর উন্নয়নের বিষয়টি জোর পাচ্ছে। রাশিয়ার সাথে ক্যাস্পিয়ান অঞ্চল, ইরান এবং ভারত মহাসাগর হয়ে ভারতীয় বাজারকে সংযুক্ত করা এই উত্তর-দক্ষিণ করিডোরটি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বাস্তব ভৌত প্রতিফলন। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একক কোনো মুদ্রার আধিপত্য হ্রাস করে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো। পুতিনের মতে, মস্কো ও ব্রিকস দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ লেনদেন এখন নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এটি কোনো আকস্মিক ডলার বর্জনের আন্দোলন নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা একক কোনো সিদ্ধান্তের কারণে যাতে বিশ্বের বাণিজ্য ব্যবস্থা থমকে না যায়, তার জন্য একটি বিকল্প ও নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়াস।

শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি সাইডলাইন কূটনীতিতেও মস্কো ও উদীয়মান দেশগুলোর কৌশলগত ঐক্য লক্ষ্য করা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের সাথে বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে যে, ব্রিকসের সম্প্রসারণ বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জোটভুক্ত দেশগুলো একধরনের নমনীয় কাঠামোর মধ্যে কাজ করছে, যেখানে অন্যের ওপর রাজনৈতিক বা আইডোলজিক্যাল মতাদর্শ চাপিয়ে না দিয়ে যার যার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং ডব্লিউটিও-এর মতো ঐতিহ্যবাহী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এশীয়, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা ভারতেরও বহুদিনের দাবি।

সবমিলিয়ে, নয়া দিল্লির এই শীর্ষ সম্মেলন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও ব্রিকস এখন আর বৈশ্বিক রাজনীতিতে কেবল প্রতিবাদের সুর নয় বরং এটি ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা। এক মেরু বিশ্ব ব্যবস্থার বদলে এমন একটি নতুন ও ন্যায্য বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সামনে একাধিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, একাধিক আন্তর্জাতিক পেমেন্ট মেকানিজম এবং বিকল্প বাণিজ্য পথ খোলা থাকবে। কোনো একক শক্তিকেন্দ্রের একক কর্তৃত্বকে হ্রাস করে একটি সুষম বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন দিল্লি ব্রিকস সম্মেলন একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights