ভারতের মণিপুরে নতুন করে সহিংসতায় তিনজনের মৃত্যু

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্য মণিপুরে সহিংসতা কমার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় নতুন করে সহিংসতার ঘটনায় অন্তত তিনজন মারা গেছেন। নিহতরা কোয়াক্তা এলাকার মেইতি সম্প্রদায়ের বলে জানা গেছে।

এই সহিংসতার ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরেও অগ্নি সংযোগ ঘটানো হয়েছে বলেও অভিযোগ।

নতুন করে এই সহিংসতার কথা জানিয়েছে বিষ্ণুপুর জেলার পুলিশ।
বিষ্ণুপুর জেলার কোয়াক্তা এলাকায় অসংখ্য মেইতি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। সেই স্থল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটারেরও বেশি আগে থেকে রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত বাফার জোন।

পুলিশ সূত্রে খবর, শুক্রবার দিবাগত রাত দুইটা নাগাদ বাফার জোন পেরিয়ে কিছু মানুষ মেইতি এলাকায় প্রবেশ করে। এরপরই তাদের ওপর গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। তাতেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের বাবা ও ছেলেও রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নিহতারা সেই সময় তাদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছিল। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের সদস্যরা।

গত বৃহস্পতিবার মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় সশস্ত্র বাহিনী এবং মেইতি সম্প্রদায়ের বিক্ষোভকারী মানুষদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত পক্ষে ২৩ জন আহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পরই নতুন করে এই সহিংসাতার ঘটনা ঘটলো।

উল্লেখ্য, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে প্রায় তিন মাস আগে জাতিগত সহিংসতা শুরু হয়েছিল, সেই থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে এবং আহতের সংখ্যা প্রায় শতাধিক। একাধিক বাড়িতে ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ এর ঘটনা ঘটানো হয়েছে, ঘর ছাড়া প্রায় কয়েক হাজার মানুষ।

অশান্তির সূত্রপাত গত ৩ মে। মেইতি সম্প্রদায়ের তফসিলি উপজাতি (এসটি) মর্যাদার দাবির প্রতিবাদে রাজ্যটির পার্বত্য জেলাগুলিতে ‘উপজাতি সংহতি মার্চ’ সংগঠিত হওয়ার পর ওই দিন প্রথম সহিংসতা শুরু হয়। এরপর থেকেই গত কয়েক মাস ধরে মণিপুরে লাগাতার সহিংসতার ঘটনা ঘটে চলেছে বলে অভিযোগ।

এরই মধ্যে সম্প্রতি ২ নারীকে বিবস্ত্র করে প্যারেড করানোর একটি ভিডিও ভাইরাল হতেই শোরগোল পড়ে যায় গোটা দেশ জুড়ে।

গত ৪ মে ভারতের মণিপুরে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের দুই নারীকে বিবস্ত্র করে প্যারেড করানো হয় বলে অভিযোগ। প্রায় আড়াই মাস পর গত ১৯ জুলাই সেই ভিডিও ভাইরাল হয়। একদিন পর ২০ জুলাই থেকে সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন থেকে মণিপুর ইস্যুতে উত্তাল হয়ে হয়েছে ভারতের সংসদ। এই ঘটনায় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করে দিনের পর দিন ভন্ডুল হয়েছে সংসদের অধিবেশন। এই ইস্যুতে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে বিরোধীরা। ৮ আগস্ট অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। ১০ তারিখ সংসদে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।

এমন এক পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের জোট ‘ইন্ডিয়া’র সাংসদরা গত সপ্তাহে মণিপুরের সহিংসতা কবলিত এলাকার ঘুরে দেখেছেন, বিভিন্ন ত্রাণ শিবিরে গিয়ে কুকি ও মেইতি সম্প্রদায়ের মানুষদের সাথে কথা বলেছেন, নির্যাতিত, নিপীড়িত নারী ও দুর্গতদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন। পাশাপাশি মণিপুরের রাজ্যপাল অনুসূইয়া উইকে’এর সাথে সাক্ষাৎ করে রাজ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে ও দূর্গতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে রাজ্যপালের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন বিরোধী দলের নেতারা।

মণিপুরের জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ মেইতি সম্প্রদায়ের। এদের বেশিরভাগই ইম্ফল উপত্যকায় বাস করেন। অন্যদিকে নাগা এবং কুকি সহ শতকরা ৪০ ভাগ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ প্রধানত পার্বত্য জেলাগুলিতে বসবাস করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights