মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কাছে আধিপত্য হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমান সংঘাতের ফলে তেহরান এই কৌশলগত জলপথকে শক্তিশালী শুল্ক আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে অবরোধের চেষ্টা চালালেও বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রণালীর চাবিকাঠি এখন মূলত ইরানের হাতেই চলে গেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের পরেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কারা যাতায়াত করবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইরান নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রমাণে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, ইরান এখন হরমুজ প্রণালীর এই নিয়ন্ত্রণকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনায় তেহরান এই প্রণালীর ওপর তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের দাবি যুক্ত করেছে। এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান মূলত তিনটি বড় লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, যার মধ্যে প্রথমটি হলো অর্থনৈতিক মুনাফা। পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার উপার্জনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যার বড় একটি অংশ আসবে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালীর এই নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করছে। ইরান বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা চাইলে যেকোনো মুহূর্তে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান ধমনী বন্ধ করে দিতে পারে। এই সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যৎ সামরিক আগ্রাসনের ঝুঁকি এবং খরচ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে তেহরান কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, বরং অর্থনৈতিক ঝুঁকির ভয় দেখিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই ভৌগোলিক সুবিধা ইরানকে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির এক বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে। জ্বালানি নির্ভর দেশগুলো যাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেজন্য তেহরান এই জলপথ ব্যবহারের সুযোগকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং অনেক রাষ্ট্রই এখন ইরানের নতুন নিয়মকানুন মেনে নিয়ে তাদের জাহাজ পরিচালনা করার কথা ভাবছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই প্রভাব খর্ব করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘অবরোধের ওপর অবরোধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তবে এই মার্কিন প্রচেষ্টা বেশ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন অবরোধ বজায় রাখার চেয়ে নিজের বাড়ির সামনের প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করা ইরানের জন্য অনেক সহজ। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধ দীর্ঘায়িত করতে চায়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য যেমন বিপর্যয়কর হবে, তেমনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যও বিশাল ব্যয়ভারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতিকে অনেকে আমেরিকার জন্য ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হিসেবে দেখছেন।
চীনের অবস্থান এই পুরো পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারা ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। মার্কিন অবরোধের কড়া সমালোচনা করলেও চীন কিন্তু ইরানের প্রণয়ন করা নতুন শুল্ক ব্যবস্থা মেনে নিয়ে তাদের জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে। যদিও একটি চীনা ট্যাংকার সম্প্রতি ঘুরে যেতে বাধ্য হয়েছে, তবুও বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন কর্মকাণ্ডকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। চীন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক মাসের তেল মজুত রাখলেও তারা আসলে ইরানের তৈরি করা নতুন বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের এই আবহে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যেও এক ধরনের উপলব্ধির সৃষ্টি হয়েছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো এখন বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী হচ্ছে। ২০২৪ সালে চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে করা মোট বাণিজ্যকে ছাড়িয়ে গেছে। চীনও এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কূটনৈতিক পদচিহ্ন বাড়িয়ে চলেছে এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বিরোধ মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইরান এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে মিলে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার স্বপ্ন দেখছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং চীন হতে পারে প্রধান সহায়তাকারী পক্ষ। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ
