মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার রোমহর্ষক সেই অভিজ্ঞতা

ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ
১৯৭১ সালে আমি ছিলাম চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত তরুণ এক অফিসার। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুজিবুর রহমান, মেজর জিয়াউর রহমান প্রমুখের সান্নিধ্যে থাকার কারণে তখন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়েও জনগণের পক্ষে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সঠিক সময়ে বিদ্রোহ করে অস্ত্রশস্ত্রসহ সদলবলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা ছিল খুবই রোমহর্ষক। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আমি সর্বপ্রথম অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি। সে সময় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন কর্নেল আবদুর রশিদ জানজুয়া এবং সহঅধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এর সঙ্গে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-মজদুর-জনতা নিজেদের জীবনবাজি রেখে অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন। ৭০-এর নির্বাচনের ফলাফলের পরই আমাদের মনে হয়েছে, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা ছাড়বে না। তাই আমরা নির্বাচিত নেতার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। কারণ তারা মনে করছে আপনি যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে পাকিস্তানি জেনারেলরা হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া সত্তরের ওই নির্বাচনের পরই দেখছি নতুন নতুন পাকিস্তানি রেজিমেন্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসছে। ১৯৭১ সালে আমরা বাঙালি অফিসার, যারা সামরিক বাহিনীতে ছিলাম তারা নিশ্চিত ছিলাম যে পাকিস্তানিদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই তারা ক্র্যাকডাউন করবে। তাই ফেব্রুয়ারি মাসেই আমরা বিদ্রোহের পরিকল্পনার কথা শেখ মুজিবুর রহমানকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু সব শুনে তিনি বলে দিলেন- না, তোমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আমার নেই।

অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের বিদ্রোহ : ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আমরা অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা বিদ্রোহ করি। তবে তা হঠাৎ করে ঝোঁকের মাথায় সংঘটিত কোনো বিদ্রোহ ছিল না, বরং তা ছিল পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত। বিদ্রোহ পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের রণকেলি গ্রামের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মেজর জিয়াউর রহমান ও আমি। ২৫ মার্চ ঢাকায় যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আমি ছিলাম চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সে সময় অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ঝানঝুয়া এবং সহঅধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহের শুরুতেই রেজিমেন্ট অধিনায়ক ঝানঝুয়া নিহত হন। এরপর ব্যারাকে ফিরে মেজর জিয়া আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এ সময় আমি তাঁর সঙ্গেই ছিলাম। প্রথমেই আমরা চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করি, সেখান থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

যুদ্ধের স্মৃতি : ১৩ এপ্রিল রাতে মেজর জিয়া আমাকে মিরসরাইয়ে যেতে বলেন এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে রাতেই রামগড় থেকে ৩৫ মাইল দূরে মিরসরাইয়ে এসে উপস্থিত হই। এ সময় আমার সঙ্গে ছিল দুই প্লাটুন প্রাক্তন ইপিআর সদস্য এবং এক প্লাটুন নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্রের মধ্যে ছিল একটি ৩ ইঞ্চি মর্টার, একটি মেশিনগান আর একটি ৭৫ মিলিমিটার-বিধ্বংসী ছোট কামান। আমরা যুদ্ধে গেরিলা কৌশল অবলম্বন করলাম। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় গোপনে রাস্তার দুই পাশে বাংকার তৈরি করে সেখানে অবস্থান নিলাম। আর শত্রুবাহিনীকে আমাদের পাতা ফাঁদে ফেলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

অপারেশন মিরসরাই : ১৯ এপ্রিল ভোরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে আমি নায়েক ফয়েজ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখলাম, প্লাটুন কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ও প্লাটুন হাবিলদার স্ব স্ব বাংকারে নেই। খবর দিয়ে দ্রুত তাদের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রস্তুতি শেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কে উঠেই চমকে গেলাম। দেখলাম, একটি মাইক্রোবাস আসছে। তার একটু পেছনে একটি সাধারণ ৩ টনি ট্রাক। তার একটু পেছনেই সারিবদ্ধভাবে আসছে ২০টি সামরিক ট্রাকের বহর। প্রতিটিই সৈন্যবাহী ট্রাক। আমি দ্রুত আড়াল হলাম। পুরো শত্রুবাহিনী আমাদের অবস্থানে ঢুকে পড়তেই আমি ফায়ার ওপেন করলাম। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে ধার করা ৭৫ মিলিমিটার-বিধ্বংসী কামান দিয়ে আমি সবচেয়ে পেছনের ট্রাকটি ধ্বংস করে দিই। হাবিলদার সিদ্দিক মর্টার ফায়ার করে সামনে ও মাঝখানের তিনটি সামরিক ট্রাক উড়িয়ে দেন। অধিকাংশ শত্রুসেনা নিজ গাড়ির মধ্যেই নিহত হয়। আমার কোম্পানি সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শত্রুসেনাদের মিরসরাইয়ে আটকে রাখে। এর মধ্যে ইপিআরের আরেকটি প্লাটুন সুবেদার সাইদুলের নেতৃত্বে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর গুলিতে হাবিলদার সিদ্দিক আহত হন। ল্যান্সনায়েক আবুল কালামও অতর্কিত এক মর্টার শেলের আঘাতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এ সময় আরও চারজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। তবে আমরা এ যুদ্ধে ১৫০ জন শত্রুসেনাকে শেষ করি এবং তাদের আটটি সামরিক যান ধ্বংস করে দিই, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এ যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার আমাকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাব প্রদান করে। লেখক : সাবেক মন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights