যে কারণে ইরানে আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে চড়া মূল্য দিতে হবে

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামার গর্বজন যতো বাড়ছে, ততোই বিশ্বজুড়ে একটি প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে; দশকের পর দশক ধরে অবরোধে জর্জরিত ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মতো মহাশক্তির সামনে এখনো পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে? ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের আকাশসীমায় একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায়, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে; তবে এরপরও তেহরানকে পুরোপুরি বশ করা সম্ভব হয়নি।

এমনকি দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের গুপ্তহত্যা এবং লেবানন ও গাজার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল করে দেওয়ার পরেও ইরানের শক্তিমত্তা নিয়ে খোদ পশ্চিমা সমরবিশারদরাই এখন চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ ক্ষমতা হারিয়ে রাশিয়ায় নির্বাসিত হওয়া এবং মস্কো নিজে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় ইরান কার্যত একা হয়ে পড়েছে। তবে তেহরানকে দমানো যাচ্ছে না।

ইসরায়েল মনে করছে ইরান বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও মুদ্রাস্ফীতির সুযোগ নিয়ে সেখানে সরকার পরিবর্তনের এটিই সেরা সময়। তবে ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এই ধারণাকে ভয়ানক ভুল হিসেবে গণ্য করছে। একে ইরাক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছে তারা।

উইলিয়াম হার্টুংয়ের মতো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণকে যতটা সহজ মনে করা হয়েছিল বাস্তব চিত্র ছিল তার সম্পূর্ণ উল্টো। এর ফলে শেষ পর্যন্ত আইএসআইএস-এর উত্থান ঘটিয়েছিল। ইরানের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে তার পরিণাম হবে অনিশ্চিত এবং সেখানে প্রবেশের পথ থাকলেও বের হওয়ার পথ মার্কিন বাহিনীর জন্য রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি হরমুজ প্রণালীর ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম ইরান। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান চাইলেই ডুবো মাইন, দ্রুতগামী নৌকা এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতের মতো তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর রপ্তানি থমকে যাওয়া। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভয়েই আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্ররাও সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে জড়াতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, গোটা বিশ্ব এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটে পড়বে।

আকাশপথে ইরান দুর্বল হলেও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ভাণ্ডার বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। গত জুনের যুদ্ধে ইরান ইসরায়েলের দিকে প্রায় ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এর মধ্যে অনেকগুলোই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, ইরানের হাতে হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল রয়েছে। এগুলো দুই থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত করতে পারে। এমনকি পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা ১৮টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও এখন ইরানের এই মিসাইল রেঞ্জের আওতায় চলে এসেছে।

২০২৫ সালের যুদ্ধের পর ইরান দমে না গিয়ে উল্টো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে তারা কয়েকশ’ ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। চীন থেকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সংগ্রহ করে তারা তাদের মিসাইল মজুত পুনরায় পূর্ণ করেছে। তরল জ্বালানির পরিবর্তে কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি সময় কয়েক ঘণ্টা থেকে মাত্র কয়েক মিনিটে নামিয়ে এনেছে ইরান। খাইবার শেকান, ফাত্তাহ-১ এবং ফাত্তাহ-২ এর মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং আঁকাবাঁকা পথে চলতে পারে। এগুলো যেকোনো রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ইরানকে এই অঞ্চলে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তর করেছে।

ইরানের নৌবাহিনীও বিশেষ সমরকৌশল নিয়ে সাজানো হয়েছে। যা প্রথাগত বড় জাহাজের বদলে ছোট এবং দ্রুতগামী নৌযানের ওপর ভিত্তি করে গড়া। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের নৌ শাখা হরমুজ প্রণালীর অগভীর পানিতে কাজ করতে সক্ষম ২৩টি গাদির-ক্লাস মিনি সাবমেরিন পরিচালনা করে। এগুলো অতর্কিত আক্রমণে পারদর্শী। এছাড়া তাদের হাতে থাকা তারেক-ক্লাস এবং ফাতেহ-ক্লাস সাবমেরিনগুলো সমুদ্রে মাইন বিছিয়ে দিতে বা ক্রুজ মিসাইল ছুঁড়তে ব্যবহার করা হয়। বিশাল মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলো ইরানের এই শত শত ছোট বোট এবং ড্রোনের ঝাঁকের সামনে এক প্রকার অসহায় হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ সামরিক বিশ্লেষক স্কট রিটার সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চাইলে যেকোনো মুহূর্তে এই অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তার মতে, ইরানি হামলায় কয়েক হাজার মার্কিন সেনার মৃত্যু হতে পারে এবং ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের দমনে মার্কিন বাহিনীর অপারেশন রাফ রাইডারের ব্যর্থতা ইরানের সক্ষমতার একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ মাত্র। যেখানে শুধুমাত্র ড্রোন ও সাধারণ মিসাইল নিয়ে হুথিরা কয়েক মাস ধরে বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির করে দিতে পেরেছিল। সেখানে ইরানের সুসংগঠিত সামরিক বাহিনী যে কত বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় এবং মুদ্রার মান তলানিতে ঠেকলেও ইরানের সামরিক অবকাঠামো মাটির নিচে সুরক্ষিত বাঙ্কারে। ইরান খোররামশাহরের মতো শক্তিশালী মিসাইল তৈরি করেছে। এটি প্রায় ১৫০০ কেজি ওজনের বিশাল বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এছাড়া তাদের শাহেদ এবং মোহাজের সিরিজের ড্রোনগুলো ইতোমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে লড়াই করে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ফলে ইরানকে আক্রমণ করার অর্থ হলো এক অন্তহীন এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, যা মার্কিন জনমত কখনোই সমর্থন করবে না।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করলেও তেহরানের বিরুদ্ধে বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপে যাওয়ার আগে তারা দশবার ভাবছে। কারণ, ইরান এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো দেশ নয় বরং আধুনিক অপ্রতিসম যুদ্ধের কেন্দ্র বিন্দু। তাদের কাছে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে জেতার ক্ষমতা না থাকলেও তারা শত্রুপক্ষকে এমন অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম, যা যেকোনো বড় শক্তির পিছু হঠার জন্য যথেষ্ট। এই ভারসাম্যপূর্ণ ভয়ই ইরানকে এখনো সরাসরি বিদেশি আক্রমণ থেকে রক্ষা করে চলেছে।

সূত্র: ইউরো এশিয়ান টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights