যে সমবায়ের কথা বলি তার জনক ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

সালমা ফাইয়াজ

আমরা আজ যে সমবায়ের কথা বলি তার জনক ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তারই চিন্তাধারার অনুসরণে তার প্রিয় ছাত্র শেরে-বাংলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং তার নিজ গ্রাম চাখারে সমবায় ব্যাংক বা কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন।

কো-অপারেটিভ ব্যাংকসমূহ ও হাল আমলে ড. ইউনূস ও এনজিওদের মাইক্রো-ক্রেডিট তারই ধারাবাহিকতায় নয়া সংস্করণ। এক সময় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মাসিক আয় ছিল পৌনে দুই হাজার টাকা। অথচ তিনি তার সকালের নাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখতেন ১ পয়সা। ১ পয়সার বেশি নাস্তা হলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন। মাসিক আয় থেকে নিজের জন্য মাত্র ৪০ টাকা রেখে দান করে দিতেন সব। ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এই ১০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একাই দান করেছিলেন ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

আজ যে আমরা মারকিউরাস নাইট্রাইড ব্যবহার করি তার জনকও তিনি, কেবল তাই নয় ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার তিনি।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্ম ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট, খুলনার পাইকগাছার রাড়ুলি গ্রামে। বাবা হরিশচন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড অসাম্প্রদায়িক। বলতেন ‘সবার আগে মানুষ, তারপর ধর্ম।’ ১৯২৫ সালে কুদরাত-এ-খুদা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন। বহু শিক্ষকের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শত বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রফুল্লচন্দ্র বলেছিলেন, ‘ও যোগ্য। ও অবশ্যই পাবে। ও মেধাবী, ওর মেধার পরিচয় ওর খাতায়। ধর্মে নয়। ধর্ম কখনো মেধার নির্ণায়ক না।’

একবার শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হক ৫-৬ দিন ক্লাসে না আসায় একদিন বিকালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার বাসায় যান। ফজলুল হক তখনও খেলার মাঠে থাকায় তিনি তার জন্য অপেক্ষা করেন। ফজলুল হক ফিরে এসে প্রফুল্লচন্দ্রকে দেখে তিনি কতক্ষণ হলো এসেছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘তোমাদের হিসাবে এক ঘণ্টা আর আমার হিসাবে ৬০ মিনিট।’

ভীষণ সময়ানুবর্তিতা ছিল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের। তার ছাত্ররাও ছিলেন জগদ্বিখ্যাত। সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, নীলরতন ধর, পুলিন বিহারী সরকার, মেঘনাদ সাহা, শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হক, বিজ্ঞানী কুদরত-ই খুদা, হেমেন্দ্র কুমার সেন, জ্ঞানেন্দ্র নাথ রায়।

তৎকালীন ভারতের অবস্থা জানার জন্য ইংল্যান্ডে সাইমন কমিশন গঠন করা হয়। লন্ডনেই তারা কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের অনেক সুনাম শুনেছেন। একদিন দুপুরের দিকে কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজে এসে দেখেন পিসি রায় গামছা পরে ধুতিখানা রোদে শুকাচ্ছেন। ঘরে ঢুকে দেখেন এক কোণে স্টোভে রান্না হচ্ছে অন্যদিকে সাদামাটা একটা খাট। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল আর একটা সাধারণ চেয়ার। পোশাক রাখার জন্য একটা কমদামি আলনা। ওখানেই এই জগৎবিখ্যাত বাঙালি গামছা পড়া অবস্থায় সেদিন সাইমন কমিশনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

লেখক: বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights