শনির দশা কাটছে না

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানিতে ধীরগতি, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা ও অর্থ পাচার-সব মিলিয়ে যেন অর্থনীতিতে শনির দশা কাটছেই না। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ঢাকা চেম্বারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে বিনিয়োগের গতি স্পষ্টভাবেই কমে গেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় কমে যাওয়া এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস পাওয়াও বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রপ্তানি খাতেও ধাক্কা লেগেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। আর সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তার চেয়েও প্রায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে রপ্তানি আয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। এর মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়েছে। শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ আরও নিরুৎসাহ হচ্ছে। এ সংকটের মধ্যেই বাড়ছে অর্থ পাচারের প্রবণতা। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঙ্কে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি।

বিশ্লেষকদের মতে হুন্ডি ও বাণিজ্যে কারসাজির মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ কেনায় এ অর্থ ব্যবহার হচ্ছে। এতে দেশে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি কমে যাচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জিডিপির সঙ্গে মোট বিনিয়োগের অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশে নিট এফডিআই (বিদেশি বিনিয়োগ) এসেছে ১১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ২৯ কোটি ডলার বা ২০ দশমিক ২২ শতাংশ। যদিও আগের অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এফডিআই কিছুটা বেড়েছিল, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। জ্বালানিসংকট, অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সবচেয়ে বড় সমস্যা জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস। গ্যাসের স্বল্পতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভুগছে আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যার তালিকা প্রায় একই-জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও প্রশাসনিক জটিলতা।’ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ। আর মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হচ্ছে। চাহিদা না বাড়লে বিনিয়োগের আগ্রহও স্বাভাবিকভাবে কমে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বাজেট প্রণয়ন দিয়ে এ পরিস্থিতির সমাধান হবে না। আমাদের প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সহজ করব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও কার্যকর সমাধান। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতি আবার গতি ফিরে পেতে পারে, না হলে এ চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। সিপিডির তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে যেখানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। ফলে রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২১ সালে মূল্যস্ফীতির এ ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। বাজারে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, শাকসবজি, মাংস সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চরম চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দামও সম্প্রতি দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। অকটেন ও পেট্রোলের পাশাপাশি এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। এর মধ্যে দেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বিদেশ থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় সুদ পরিশোধেই বড় অংশ চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে অনেক আমানতকারীর ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারার অভিযোগও সামনে আসছে, যা আর্থিক খাতের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে এখন জটিল সমীকরণ। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে কমে যাওয়া বিনিয়োগ, ঋণের চাপ, রপ্তানিতে ধীরগতি ও অর্থ পাচার-সবকিছু মিলে প্রবৃদ্ধির পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights