শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আহতদের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন দাবিতে বরিশালে সংবাদ সম্মেলন
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন দাবিতে বরিশালে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বরিশাল প্রেসক্লাবে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ছাত্র-জনতা ও শহীদ পরিবার, বরিশাল বিভাগের’ ব্যানারে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত বরিশাল আইন মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রহমতুল্লাহ সরকার সাব্বির বলেন, ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রথম থেকে ছিলেন তিনি।
এখনও রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ২৪ এর আন্দোলনে গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে দুই মাস ঢাকায় চিকিৎসাধীন ছিলাম। বরিশাল ফিরে এসে হতাহতের খোঁজ নিই।
রহমতুল্লাহ সরকার বলেন, বরিশালের সন্তান শহীদ পরিবারের খোঁজ কেউ সেভাবে নেয়নি। তেমনি আহতদেরও সেভাবে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা বরিশাল বিভাগ ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছি। যেখানে বরিশাল জেলায় ৩০ জন শহীদ ও চার শতাধিক আহতের বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি। তবে কাজটি শেষ না হওয়ায় এখনও সঠিক তথ্য প্রকাশ সম্ভব হয়নি।
এ সময় শহীদ পরিবারের জন্য কিছু দাবি তুলে ধরেন তিনি।
দাবির বিষয়ে রহমতুল্লাহ সরকার বলেন, আমরা শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাটের নামকরণ তাদের নামে করার দাবি জানাচ্ছি। এছাড়াও শহীদদের পরিবারকে এককালীন অর্থ প্রদান ও মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা, প্রত্যেক শহীদ পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি প্রদান। পাশাপাশি আহতদের সুচিকিৎসা করা এবং সারাজীবন এটি অব্যাহত রাখা, প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে আহতদের চিকিৎসা করানোর দাবি জানাচ্ছি। সেইসাথে আহতদের প্রত্যেককে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা, মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা, এককালীন অর্থের ব্যবস্থা করা এবং আহতদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদান করার দাবি জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় গুলিতে নিহত সেলিম তালুকদার রমজান (২৮) এর বাবা সুলতান তালুকদার ও মা সেলিনা আক্তারও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
নিহত সেলিমের বাবা সুলতান তালুকদার বলেন, আমারছেলে চাকরি করলেও সে মৃত্যুর আগে বলেছে আবু সাঈদ জীবন দিতে পারলে আমি কেন পারবো না। এরপর সত্যি সত্যিই সে জীবন দিয়ে দিল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে বাড্ডার ব্রাক ইউনিভার্সিটির সামনে গুলিতে গুরুতর আহত হয় সে। এরপর সেখানকার লোকজন তাকে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখান থেকে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে নিলেও আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে কেউ ভর্তি নেয়নি। পরে চাকরিজীবী পরিচয়ে ভর্তি করি। সেলিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সাথে যখন পাঞ্জা লড়ছিল তখন শত চেষ্টা করেও আমরা বাঁচাতে পারিনি। আমার ছেলেও গেল, সবই গেল।
তিনি বলেন, ছেলেকে বাঁচাতে যখন কেউ পাশে ছিল না, তখন ধার দেনা করতে হয়েছে। কিন্তু একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়ে এখন বৃদ্ধ বয়সে সেই দেনার টাকা কীভাবে পরিশোধ করবো বুঝতে পারছি না। আমার একটাই ছেলে, সে নাই এখন কার দিকে তাকিয়ে থাকবো।
তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে ছেলে যে কষ্ট পেয়েছে তাতে মৃত্যুর পর কষ্ট না দেওয়ার জন্য ময়নাতদন্ত করতে চাইনি। অনেকে মামলা দিতে বলেছিল কিন্তু হয়রানির শিকার হবো, বিধায় করিনি। কিন্তু আল্লাহর কাছে ঠিকই মামলা করেছি। তবে তাই বলে কারও কাছে কি কোনও বিচার বা ভালো কিছু পাওয়ার আশা করতে পারবো না। আমি শহীদ ও আহতদের সবার পক্ষে বিচার চাই এবং সবার খোঁজখবর যেন সরকার নেয়, প্রয়োজন অনুযায়ী যেন তাদের পাশে দাঁড়ায় এই আমার চাওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্য শহীদ ও আহতদের পরিবারের স্বজনরাও আক্ষেপ করেন, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সেভাবে খোঁজখবর না নেওয়ায়। সেইসাথে বরিশালের সন্তান যারা এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
