সব হারিয়েও মুখে হাসি! যা বলছে আধুনিক বিজ্ঞান

স্পোর্টস ডেস্ক

খেলার মাঠে চরম পরাজয় বা ব্যর্থতার পর অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের মুখে দেখা যায় এক টুকরো হাসি। লুকা মদ্রিচ, কেন উইলিয়ামসন, রজার ফেডেরার কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তারকারা বড় হার বা হতাশার মুহূর্তেও নিজেদের সংযত রাখেন। অনেকের কাছে এটি স্পোর্টসম্যানশিপের প্রকাশ হলেও আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর লুকা মদ্রিচের হাসিমাখা মুখ কিংবা ২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনালে হৃদয়ভাঙা পরাজয়ের পর কেন উইলিয়ামসনের শান্ত অভিব্যক্তি আবারও এই বিষয়টি আলোচনায় এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম মানসিক চাপ বা আবেগের মুহূর্তে মানুষের মস্তিষ্ক কখনও কখনও বিপরীতধর্মী আবেগ প্রকাশ করে। মনোবিজ্ঞানে একে ‘Incongruent Affect’ বা ‘Dimorphous Expression’ বলা হয়। অর্থাৎ, প্রচণ্ড দুঃখের মাঝেও হাসি কিংবা অতিরিক্ত আনন্দে চোখে জল, দুটিই একই ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ড. ওরিয়ানা আরাগনের গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করতে মস্তিষ্ক এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। চরম পরাজয়ের পর শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে যায়। একই সময়ে মস্তিষ্ক এন্ডোরফিন ও ডোপামিন নিঃসরণ করে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করে। এর ফলেই অনেক সময় মুখে ফুটে ওঠে এক টুকরো হাসি।

মনোবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে ‘Emotional Homeostasis’ বলা হয়। অর্থাৎ, মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় আবেগের ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। অতিরিক্ত দুঃখ বা আনন্দ, দুই অবস্থাতেই সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বিপরীতধর্মী আবেগ প্রকাশ পেতে পারে।

ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলোয়াড়রা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ সামলানোর বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। তাই তারা জানেন, ফলাফল সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও নিজের প্রচেষ্টা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেই কারণেই পরাজয়ের পর অনেক সময় তাদের মুখে যে হাসি দেখা যায়, তাকে বিশেষজ্ঞরা ‘Smile of Acceptance’ বা বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে নাটকীয়ভাবে হারের পর কেন উইলিয়ামসনের হাসিমাখা মুখ আজও ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারলেও লুকা মদ্রিচ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা রজার ফেদেরারের সংযত হাসি তরুণ সতীর্থদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হাসি পরাজয়ের আনন্দ নয়; বরং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা, আত্মসংযম এবং কঠিন বাস্তবতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতার প্রতিফলন। আধুনিক ‘Sports Psychology’ ও ‘Neuroscience’ বলছে, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও নিজেকে সামলে রাখতে মস্তিষ্ক অনেক সময় হাসিকেই বেছে নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights