সরকারি অর্থে উপজেলা চান এমপিরা!

রফিকুল ইসলাম রনি
কোনোভাবেই ‘উপজেলার’ কর্তৃত্ব হাতছাড়া করতে নারাজ এমপিরা। আত্মীয়স্বজনদের পাশাপাশি ‘মাইম্যান’ বসাতে তাঁরা মরিয়া। এজন্য যেখানে যেমন শক্তি প্রয়োগ বা কৌশল প্রয়োজন তার সবই করছেন তাঁরা। কেউ কেউ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন ‘সরকারি’ অর্থ। টিআর ও কাবিটার টাকায় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং থানা-ওয়ার্ড নেতাদের দিয়ে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট করাচ্ছেন অনেক এমপি। ডজনখানেক এমপির বিরুদ্ধে কাবিটা বরাদ্দের লোভ দেখিয়ে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করানো, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। যেসব উপজেলায় ভোট হচ্ছে, সেসব এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, সংসদীয় এলাকায় এমপিরাই অভিভাবকের আসনে। সবকিছুতে তাঁরাই ছড়ি ঘোরান। এমপিদের বাইরে গেলে সরকারি কোনো বরাদ্দ পাবেন না বা পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপপ্রতুল। এ ছাড়া আগামী বছরই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। সামনের ইউপিতেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী না দেওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে এমপিদের ‘ইশারা’ বিজয়ের অনেকটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন মাঠের নেতারা। তাই চাইলেও এখন এমপিদের বাইরে যেতে পারছেন না। অনেকটা বাধ্য হয়েই এমপির পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোটে মাঠে নেমেছেন তারা।

অভিযোগসূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি ড. আনোয়ার হোসেন খাঁন কাবিটা বরাদ্দের লোভ দেখিয়ে তাঁর পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করাচ্ছেন। তাঁর নির্বাচনি এলাকার রামগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী ইমতিয়াজ আরাফাত নির্বাচন কমিশনে এ অভিযোগ দাখিল করেছেন। তিনি দাবি করছেন, কাবিটার বরাদ্দের লোভ দেখিয়ে অন্য চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দেওয়ান বাচ্চুর পক্ষে ভোট চাচ্ছেন এমপি। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, এমপি আনোয়ার হোসেন খাঁন পৌর মেয়র-কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্যদের উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দেওয়ান বাচ্চুর (মোটরসাইকেল প্রতীক) পক্ষে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এমপির পক্ষে তাঁর পিএস (একান্ত সচিব) এলজিইডির কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের লোভ দেখিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে ওই প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। কুমিল্লার একটি উপজেলায় একজন এমপি উন্নয়নের বরাদ্দ নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানদের তাঁর ভাইয়ের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই এমপির ভাষ্য ছিল এমন-‘টাকা নাও, আমার প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী কর।’

জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ২০১৬ অনুযায়ী, এমপি যদি নির্বাচনি এলাকার ভোটার হন তাহলে শুধু ভোট দিতেই কেন্দ্রে যেতে পারবেন। কিন্তু অনেক এমপি নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে সমন্বয় সভা, উন্নয়ন সভা করে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ দলীয় কার্যক্রমে সরাসরি অংশ না নিলেও রাতে নিজ বাসায় ভোট হওয়া সংশ্লিষ্ট উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-সদস্য, পৌর মেয়র-কাউন্সিলর এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করছেন। পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে জনপ্রতিনিধিদের কাবিটা বরাদ্দ বেশি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলে আগামী ইউপি ভোটেও তাঁর পক্ষে এমপিরা থাকবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
২৯ মে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ভোট গ্রহণ হবে। সে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু। স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নিয়ম ভঙ্গ করে ইউপি চেয়ারম্যানদের নিয়ে একাধিকার বৈঠক করেছেন। একই সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যানদের কাবিটার বরাদ্দ দিতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

দ্বিতীয় ধাপে রাজশাহী বিভাগে একটি উপজেলায় ভোট হচ্ছে। নিয়ম ভঙ্গ করে সে উপজেলায় গেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপি। দুই দিন এলাকায় থেকে সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নিলেও রাতে কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার নিয়ে বৈঠক করে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন আনারস প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান বাকী বিল্লাহ। তিনি পাবনা-৩ আসনের এমপি মকবুল হোসেনের ছেলে চেয়ারম্যান প্রার্থী গোলাম হাসনাইন রাসেলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। গত রবিবার পাবনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘রাসেল আমার কর্মী-সমর্থকদের ওপর নানা অত্যাচার-নির্যাতন করছে। হামলা-মামলার ভয় দেখানোর কারণে তারা হতাশাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে আমার নির্বাচন করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালাম।’ ২১ মে লক্ষ¥ীপুরের একটি উপজেলায় ভোট গ্রহণ হবে। সে উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী স্থানীয় এমপির বোনজামাই। ভোট গ্রহণ শুরুর আগে ওই এমপি বৈঠক করে বোনজামাইকে একক প্রার্থী ঘোষণা দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। অন্যরাও প্রার্থী হয়েছেন। পরে ওই উপজেলার ১০ ইউনিয়নের মধ্যে আট ইউপি চেয়ারম্যানকে হাত করেছেন এমপি। বোনজামাইয়ের পক্ষে মাঠে নামিয়েছেন। এখানেও সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। তৃতীয় ধাপে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় এমপি এবং কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুস শহীদের ভাই ইমতিয়াজ আহমেদ বুলবুল। এ উপজেলার সবকটি ইউপির চেয়ারম্যান মন্ত্রীর ভাইয়ের হয়ে মাঠে নেমেছেন।

একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমপিদের বাইরে গিয়ে অন্য প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলে তাঁদের কপাল পোড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে। কারণ টিআর-কাবিটা বরাদ্দসহ ইউপিতে উন্নয়নের জন্য এমপির প্রয়োজন। এ ছাড়া আগামী বছর যেহেতু ইউপি ভোট হবে, সে কারণে এমপিরাই প্রার্থী কে হবেন তা নির্ধারণ করে দেবেন। তাই তাঁরা এমপিদের পছন্দের প্রার্থীর হয়ে কাজ করছেন।

রাজনীতি-বিশ্লেষকরা বলছেন, এমপি-মন্ত্রীরা উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চান না। সে কারণে আত্মীয়স্বজনদের প্রার্থী করেছেন। আত্মীয়স্বজন না হলেও তাঁদের ‘মাইম্যান’ প্রার্থী করছেন, যাতে সব সুবিধা নিজেরাই ভোগ করতে পারেন, অন্য কেউ নয়। আর ভবিষ্যতেও তাঁদের (মন্ত্রী-এমপি) প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না।

গতকাল চাঁদপুরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘এবারের উপজেলা নির্বাচনে দল থেকে কোনো দলীয় প্রতীক, দলীয় মনোনয়ন কিংবা সমর্থন কাউকে দেওয়া হয়নি। সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মন্ত্রী-এমপি যাঁরা, তাঁরা এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো অন্যায় হস্তক্ষেপ করবেন না। নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রত্যেকে নিজের যোগ্যতার কথা বলে ভোট চাইবেন। কোনো নেতা-কর্মীকে যেন তাঁরা অন্যভাবে চাপ প্রয়োগ না করেন তাদের পক্ষে যাওয়ার জন্য। সবাই নির্বাচন করুক। স্বাধীনভাবে নির্বাচন করার অধিকার সবার আছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights