সাংসদ পদ ফিরে পেতেই রাহুলকে কংগ্রেস ও বিরোধীদলের সাংসদদের অভিনন্দন

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

সাংসদ পদ ফিরে পেলেন ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ‘মোদি’ পদবি মামলায় সুরাতের নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার সদস্য পদ খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই রায়ের উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার পরেই ফের সংসদে কামব্যাক করেন রাহুল। প্রায় চার মাস পর সংসদে ফিরলেন এই কংগ্রেস সংসদ সদস্য।

সোমবারই লোকসভার সচিবালয় থেকে এ সম্পর্কিত একটি বিবৃতি জারি করা হয়। তাতে বলা হয়, লোকসভার সদস্য হিসেবে রাহুল গান্ধীর অযোগ্যতা সম্পর্কিত বিষয়টি প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার সংসদ সদস্য পদ পুনর্বহাল করা হয়েছে।

এই মুহূর্তে সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশন চলছে। সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার পর এদিন সংসদ ভবনে পৌঁছাতেই কংগ্রেসের সাংসদদের মধ্যে উৎসাহ ছড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেসের পাশাপাশি বিরোধী দলের জোট ‘ইন্ডিয়া’র অনেক সাংসদই প্রধান ফটকে এসে তাকে স্বাগত জানান। এসময় ‘রাহুল গান্ধী জিন্দাবাদ’, ‘রাহুল গান্ধী আগে চলো, দেশ তোমার সাথে আছে’, ‘ইন্ডিয়া’ বলে মুহুর্মুহু স্লোগান দিতে থাকেন তারা। অনেককেই নিজেদের মোবাইলে রাহুলের ছবি ধারণ করতে দেখা যায়। এরপর সংসদ চত্বরে দেশটির জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাহুল। সেখানেও ‘রাহুল গান্ধী জিন্দাবাদ’ ও ‘সত্যমেব জয়তে’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন কংগ্রেস সংসদরা। পাশাপাশি গণমাধ্যমের কর্মীরাও ভিড় জমান রাহুলের ছবি তোলার জন্য।
রাহুল গান্ধীকে সাংসদ হিসেবে পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত একটি ‘স্বাগত পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, এই সিদ্ধান্ত ভারতের জনগণের জন্য এবং বিশেষ করে ওয়েনাড় কেন্দ্রের মানুষের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসবে।

কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করে খাড়গে বলেন, তাদের মেয়াদের যেটুকু সময় বাকি আছে, বিজেপি এবং মোদি সরকারের উচিত বিরোধী নেতাদের লক্ষ্য করে গণতন্ত্রের অবমাননা না করে প্রকৃত শাসনে মনোনিবেশ করে সেই সময়ের সদ্ব্যবহার করা।

রাজ্যসভায় কংগ্রেসের উপনেতা প্রমোদ তিওয়ারি জানান, সত্যের জয় হয়েছে, আর মিথ্যার পরাজয় হয়েছে। ভারত জিতেছে, আমাদের সিংহ রাহুল গান্ধী জিতেছেন। মোদিজি, আপনার পরাজয় শুরু হয়েছে।

রাহুলের সাংসদ পদ ফিরে পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তর এবং ১০ নম্বর জনপথে অবস্থিত সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনের বাইরেও বিজয় উল্লাস শুরু হয়ে যায়। রাহুলের ছবি দেওয়া ফ্লেক্স নিয়ে রঙিন পোশাকে সেজে চলে নাচ-গান, লাড্ডু বিতরণ।

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকেও দেখা যায় তার চেম্বারে বসে নিজের দলের সাংসদ এবং বিরোধী দলের সাংসদদের মিষ্টি খাওয়াতে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। এরপর কর্নাটকের কোলারে নামক জায়গায় এক দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে এক নির্বাচনী প্রচারণায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে গোটা ‘মোদি’ সম্প্রদায়কে অবমাননা করার অভিযোগ ওঠে রাহুলের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করেই সে সময় রাহুল আওয়াজ তুলেছিলেন ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’।

কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীর কটাক্ষ, ‘নীরব মোদি, ললিত মোদি কিংবা নরেন্দ্র মোদি-যেই হোক না কেন, সব চোরদেরই পদবি মোদি হয় কি করে?’

মূলত কয়েক হাজার কোটি রুপি আত্মসাৎ করে ভারত থেকে বিদেশে পলাতক নীরব মোদি বা সাবেক আইপিএল চেয়ারম্যান ললিত মোদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তুলনা করে এই মন্তব্য করেছিলেন রাহুল।

এরপরই ২০১৯ সালের ১৩ এপ্রিল সুরাতের জেলা দায়রা আদালতে রাহুলের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক মানহানির মামলা দায়ের করে বিজেপি বিধায়ক পূর্ণেষ মোদি।

মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, রাহুলের এই মন্তব্যের ফলে গোটা ‘মোদি পদবিভুক্ত মানুষকে অপমান করা হয়েছে। সেই মামলাতেই গত ২৩ মার্চ রাহুলকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৯ এবং ৫০০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দুই বছরের জন্য কারাদণ্ডের সাজা দেয় আদালত। এর একদিন পর ২৪ মার্চ কেরেলার ওয়েনাড় কেন্দ্রের সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধীর সাংসদ পদ বাতিল হয়।

ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রথমে গুজরাট হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন রাহুল। গত শুক্রবার সেই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেয় দেশটির শীর্ষ আদালত। শীর্ষ আদালতের নির্দেশেই ফের সাংসদ পদ ফিরে পান রাহুল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুসারে আগামী বছর, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও লড়তে পারবেন রাহুল।

এদিকে এমন একটা সময় রাহুল তার সাংসদ পদ ফিরে পেলেন, যখন মণিপুর ইস্যুতে উত্তাল হয়ে রয়েছে ভারতের সংসদ। গত ২০ জুলাই থেকে সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন থেকে মণিপুর ইস্যুতে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করে দিনের পর দিন ভন্ডুল হয়েছে সংসদের অধিবেশন। এই ইস্যুতে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে বিরোধীরা। ৮ ও ৯ আগস্ট- দুই দিন অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। ১০ তারিখ সংসদে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।

আর সেই অনাস্থা প্রস্তাবেই রাহুলের উপস্থিতিতে মণিপুরের আইন-শৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নিয়ে সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে পারে বিরোধীরা। তার সদস্যপদ পুনরুদ্ধার হওয়ার পর, কংগ্রেসের বক্তব্য মঙ্গলবার লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব বিতর্কে রাহুলকেই মূল স্পিকার (key speaker) করতে চায়।

কংগ্রেস সাংসদ মানিকম ঠাকুর বলেছেন, গত ২৯ জুন রাহুল গান্ধী মণিপুর সফর করেছেন, রাজ্যপাল অনুসূয়া উকেই-কের সাথে সাক্ষাৎ করে সেখানকার মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। তাই দল চায় যে তিনি এই অনাস্থা প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ গ্রহণ করুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights