সাদামাটা কুচকাওয়াজে পুতিন বললেন, ‘বিজয় আমাদেরই হবে’

অনলাইন ডেস্ক

চাপে পড়েও বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী ভাষণ দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে এবারের সাদামাটা আয়োজন এক চরম দুর্বলতাও উন্মোচিত করেছে মস্কোর।

শনিবার রেড স্কোয়ারে কুচকাওয়াজ ছিল সীমিত পরিসরে ও অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। আয়োজনে ছিল ইউক্রেনের হামলার আশঙ্কা ও যুদ্ধক্লান্তির আবহ। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শঙ্কায় মস্কোজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা জারি করা হয়। এমনকি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়।

সেই কঠোর সতর্কতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা দেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিজয় ‘অবশ্যই হবে’। তিনি বলেন, ‘বিজয় সবসময়ই আমাদের ছিল এবং থাকবে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি টেনে ইউক্রেনে যুদ্ধরত সেনাদের প্রতি সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন পুতিন। বিজয় দিবসের ভাষণে তিনি দাবি করেন, ন্যাটো সমর্থিত ‘আগ্রাসী শক্তির’ বিরুদ্ধে লড়েও রুশ বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। পুতিন বলেন, ‘বিজয়ী প্রজন্মের মহান কীর্তি বিশেষ সামরিক অভিযানের দায়িত্ব পালনকারী যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করছে। তারা ন্যাটো সমর্থিত এক আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বীরেরা এগিয়ে চলেছে। বিজয় সবসময় আমাদেরই ছিল এবং থাকবে।’

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আয়োজন রাশিয়ার শক্তি প্রদর্শনের বদলে উল্টো তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকেই সামনে নিয়ে এসেছে। কুচকাওয়াজের আগ পর্যন্ত মস্কোতে ইউক্রেন হামলা চালাতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল প্রবল।

শেষ মুহূর্তে স্পষ্ট হয়, ইউক্রেন এই অনুষ্ঠানে সরাসরি হামলা চালাবে না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন তিন দিনের যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।

যেমন ছিল আয়োজন

এবারের কুচকাওয়াজে রাশিয়ার প্রচলিত ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাঁজোয়া যান প্রদর্শন প্রায় অনুপস্থিত ছিল। ২০১৭ সালের পর থেকে যা ছিল সামরিক কুচকাওয়াজের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এর পরিবর্তে অতিথিদের সামনে ড্রোন সক্ষমতা ও পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বেলারুশ, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের নেতাদের ছোট একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল। সেখানে উত্তর কোরিয়ার সেনাদেরও মার্চ করতে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। তাদের সেনারা ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর জন্য লড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রায় ৪৫ মিনিটের এই কুচকাওয়াজ আগের বছরগুলোর তুলনায় প্রায় অর্ধেক সময় ধরে চলে। ক্রেমলিনপন্থী ভাষ্যকার সের্গেই মার্কভ টেলিগ্রামে এটিকে ‘সাদামাটা কুচকাওয়াজ’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সামনে এখনো বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

রুশ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো প্রধানত ভ্লাদিমির পুতিনকে রক্ষার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। যা স্পষ্ট করে দেয়, যে যুদ্ধে রাশিয়া একসময় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জয়ের আশা করেছিল, তার হিসাব-নিকাশ কতটা নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ছিল, শনিবার তিনি আগের বছরগুলোর মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রবীণ যোদ্ধাদের পাশে বসেনটি। বসেছিলেন ইউক্রেনে যুদ্ধ করা সৈন্যদের মাঝে।

যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জেলেনস্কি

সপ্তাহের শুরুতে পুতিন কুচকাওয়াজের বিষয় মাথায় রেখে যুদ্ধবিরতির জন্য ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রস্তাব দেন। তবে ইউক্রেন প্রাথমিকভাবে এই প্রস্তাবকে ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে রাশিয়ার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। তবে পরে কিছুটা ব্যাঙ্গাত্মক সুরে জেলেনস্কি এক ডিক্রির মাধ্যমে ঘোষণা করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাশিয়াকে আক্রমণ না করার মাধ্যমে, ইউক্রেন এই অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেবে। যা যুদ্ধবিরতি ১১ মে পর্যন্ত চালু থাকবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপাতত বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সমাপ্তির নির্দিষ্ট সময়সীমাও ঘোলাটে হয়ে গেছে। যা রাশিয়ার অভ্যন্তরের পরিস্থিতিও ক্রমশ খারাপ করছে।

কুচকাওয়াজের কয়েক সপ্তাহ আগে সতর্কতা হিসেবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় জনরোষকে উস্কে দিয়েছে। দেশটির ব্যাপক সামরিক ব্যয়, বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতেও এখন চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ রুশ নাগরিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উভয়কেই সংকটে ফেলছে। অন্যদিকে, বাজেট ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। যা পুতিনের জনপ্রিয়তার হারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।

যুদ্ধের পরিস্থিতি

রণক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একইভাবে হতাশাজনক। রুশ সৈন্যরা প্রায় স্থবির হয়ে আছে এবং কোনো পক্ষই সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে যেতে পারছে না বলে মতামত বিশ্লেষকদের। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অগ্রগতি কমে গেছে। উভয় সেনাবাহিনীর সদস্যরাই ব্যাপক হতাহতের শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি তারা একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে, এসবের কিছুই পুতিনকে আপসের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সামান্য লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চল থেকে কিয়েভের বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সুযোগ দেখছে না মস্কো। তবে রাশিয়ার এই শর্তও কিয়েভ ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টেলিগ্রাফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights