সুরের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মো. খুরশীদ আলম

শাইখ সিরাজ

আমাদের দেশের সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র আর সংগীতের যে বিশাল আঙিনা, সেখানে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের মেধা আর শ্রমে তৈরি করেছেন এক একটি সোনালি অধ্যায়। লক্ষ্য করলাম ওই মানুষগুলোকে নিয়ে তথ্যনির্ভর জীবনিধর্মী তেমন কোন ডকুমেন্টারি পাওয়া যায় না। অথচ মানুষগুলো সময়ের নিয়মে হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের জীবনের গল্পগুলো, তাদের চিন্তা ও কথাগুলো কোন না কোনভাবে ধরে রাখার ইচ্ছে থেকে শুরু করেছিলাম সাক্ষাৎকারমূলক জীবনিধর্মী ডকুমেন্টারি নির্মাণ। তারই ধারাবাহিকতায় নায়করাজ রাজ্জাক, সাবিনা ইয়াসমিন এবং সৈয়দ আব্দুল হাদীকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি। ১ আগস্ট সংগীতশিল্পী মো. খুরশীদ আলম ৮১ বছরে পা রেখেছেন।

তাঁকে নিয়ে ‘হৃদয়ে কী সুর বাজে’ শিরোনামে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে আগ্রহী হলাম। এটা নির্মাণ করতে গিয়ে খুব কাছ থেকে মো. খুরশীদ আলমকে জানার সুযোগ হলো। তিনি এমনিতেই আজ আমাদের ঘরের মানুষ। চ্যানেল আইয়ে তাঁর পদচারণা সবসময়ই থাকে। আমাদের অ্যাকাউন্টস প্রধান জিয়ার সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। যেমন তিনি প্রাণ খুলে গান করেন, তেমনি সকল মানুষের সাথেই প্রাণ খুলে মেশেন।

তিনি শুধু তার কণ্ঠের জাদুতে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে রাখেননি, বরং এদেশের সংগীতের বিবর্তনের এক অন্যতম সাক্ষী হয়ে আছেন। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসেও তিনি তার নীতি আর আদর্শে অবিচল। হতাশা যাকে কখনও ছুঁতে পারেনি। ১৯৪৬ সালে তখনকার বগুড়ার, বর্তমানে জয়পুর হাটের কালাই উপজেলার হারুঞ্জা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খুরশীদ আলম। জন্মের বছরই চলে আসেন ঢাকায়।

খুরশীদ আলমের বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার মাটিতে। সেখানকার নবাবপুর স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন। তবে তার সংগীতের শুরুটা মোটেই মসৃণ ছিল না। পরিবারে গান-বাজনার চর্চা তো দূরের কথা, এটি কেউ পছন্দই করতেন না। বাড়ির ঠিক পাশেই ছিল মসজিদ, এলাকার পরিবেশও ছিল বেশ রক্ষণশীল ও ধার্মিক। এমন এক পরিবেশে গানের চর্চা করা ছিল রীতিমতো দুঃসাহসিক কাজ।

তবে প্রতিভাকে কি আর দমিয়ে রাখা যায়? তার এক চাচা ছিলেন, ডা. আবু হায়দার সাইদুর রহমান, যাকে সবাই ‘ডা. মাস্তানা’ বলে ডাকত। ‘কুয়াশা’ ছদ্মনামে তিনি লেখালেখিও করতেন। এই রবীন্দ্রসংগীত প্রেমী চাচার কাছেই সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন খুরশীদ আলমের গানে হাতেখড়ি। এরপর স্কুলের এক শিক্ষকের কাছেও তালিম নিতে থাকেন।

এক বিকেলে তাঁকে নিয়ে গেলাম নবাবপুর স্কুলে।
১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালের কথা। তখন সারা দেশ তিন বিভাগে বিভক্ত। ঢাকা কলেজে অনুষ্ঠিত স্কুল পর্যায়ের গানের প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে টানা দু’বার আধুনিক ও রবীন্দ্রসংগীতে প্রথম হন এই তরুণ। পরবর্তীতে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ বারিন মজুমদারের কলেজে প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। সেখানে বাবু নামের এক বড় ভাইয়ের কাছে রবীন্দ্রসংগীত এবং লুৎফর রহমানের কাছে নজরুল সংগীতের তালিম নেন তিনি।

পেশাদার শিল্পী হিসেবে খুরশীদ আলমের আত্মপ্রকাশ তৎকালীন পাকিস্তান বেতারের মাধ্যমে। তবে সেই গল্পটি বেশ রোমাঞ্চকর। সে সময় বেতারে গাইতে হলে এদেশের শিল্পীদের গান গাইতে হতো, কিন্তু তরুণ খুরশীদ তখন মূলত ভারতীয় শিল্পীদের গান করতেন।

অডিশন দেওয়ার প্রবল ইচ্ছে, কিন্তু গান জানা নেই! খন্দকার ফারুক আহম্মেদ ছিলেন তার দেশি বড় ভাই। তার কাছে গিয়ে খুরশীদ আলম তার অসহায়ত্বের কথা জানালেন। ফারুক আহম্মেদ তাকে আজিমপুরের বাসায় ডেকে নিয়ে মাত্র দু’দিনে সাতটি গান শিখিয়ে দিলেন।

অডিশনের দিন স্টুডিওতে উপস্থিত আবদুল আহাদ, ফেরদৌসী রহমানদের মতো বাঘা বাঘা ব্যক্তিত্ব। তরুণ খুরশীদ একে একে ছয়টি গান গাইলেন। বুকে তখন ভয়, সাত নম্বরটি গাওয়ার পর যদি বিচারকরা আরও একটি গান শুনতে চান! তার তো আর গান জানা নাই। তবে তাকে আর গাইতে হয়নি।

১৯৬৭ সালে বেতারে তার প্রথম গান রেকর্ড হয়। একদিনে রেকর্ড হওয়া ‘তোমার দু হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ এবং ‘চঞ্চল দুনয়নে’ গান দুটির মধ্যে প্রথমটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

এই বেতার জীবনেই আরেক কিংবদন্তি সমর দাসের সাথে তার পরিচয়। সমর দাস তাকে বলেছিলেন, “তোমার গলা তো খুব ভালো, তুমি কাউকে অনুসরণ কর। যতদিন ঐ শিল্পী জীবিত থাকবে ততদিন তোমাকে কেউ বলবে না খুরশীদ আলম গান করছে। তবে ওই শিল্পীর মৃত্যুর পর তোমাকে লোকে চিনবে তোমার নামেই।” এরপর টানা ছয় মাস প্রতিদিন সকাল সাতটায় সমর দাসের কাছে সা-রে-গা-মা শিখেছেন তিনি, এবং সমর দাস তার কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেননি।

খুরশীদ আলমের প্লেব্যাক জীবনের শুরুটা এক অদ্ভুত নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে। বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ ছবির জন্য গান রেকর্ডিংয়ের দিন স্টুডিওতে উপস্থিত তরুণ খুরশীদকে দেখে অনেকেই ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন, “এই ছেলে কী গান গাইবে! কণ্ঠশিল্পী পাল্টাতে হবে।” কিন্তু চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালক আজাদ রহমান খুরশীদ আলমের প্রতি ছিলেন আস্থাবান। তিনি বললেন, খুরশীদ আলম গান না গাইলে আমিও এই সিনেমার সংগীতের কাজ করবো না।

গানটি ছিল নায়করাজ রাজ্জাকের লিপের। রাজ্জাক সাহেব নিজে তরুণ খুরশীদকে তার গাড়িতে করে বাসায় নিয়ে যান। কীভাবে হাসতে হবে, কথা বলতে হবে, এমনকি দারোয়ান বা নিজের স্ত্রীর সাথে কেমন আচরণ করেন সবকিছু খুরশীদ আলমকে দেখিয়ে দেন। খুরশীদ আলম স্মৃতিচারণ করতে করতে বললেন, “আমিও মনোযোগী ছাত্রের মত নিজের ভিতরে ধারণ করতে থাকলাম রাজ্জাক সাহেবকে।”

অবশেষে সুরকার আজাদ রহমানের দৃঢ়তায় রেকর্ড হলো সেই অমর গান ‘বন্দি পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’। সিনেমা মুক্তির পর গানটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে খুরশীদ আলমের রাজকীয় উত্থান ঘটে। এরপর ‘পিচ ঢালা পথ’ ছবিতে ‘আমি পাগল পাগল দুনিয়ায়’ এবং ‘সাধারণ মেয়ে’ ছবিতে জাফর ইকবালের লিপে গান গাওয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বর্তমান প্রজন্মের রিয়েলিটি শো এবং সংগীতাঙ্গন নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা ও স্পষ্টবাদী এই শিল্পী। তিনি বলেন, “রিয়েলিটি শোতে যে সব শিল্পীদের আনা হয় ঐ শিল্পীকে যদি প্রপার গাইড করা না হয় তারা টিকবে না। শুধু অডিও সিডি বের করে আর বিদেশ ঘুরিয়ে আনলে শিল্পী তৈরি হয় না।… আমরা একটা গান ৩০-৪০ বার গেয়ে ফাইনাল রেকর্ড করেছি। এখন দু-একবার গেয়েই রেকর্ড করে। বাকিটা ফিনিশিং করে মেশিনে। এভাবে তো আর একজন ভালো শিল্পী তৈরি হয় না।”

তবে নতুনদের তিনি একবারে বাতিল করে দেন না। তিনি বোঝেন, ভালো গীতিকার ও সুরকারের অভাবে আজকের শিল্পীদের লড়াইটা ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমানের শিল্পীরাও ভালো করার চেষ্টা করছেন এবং সময় তাদের কাজের মূল্যায়ন করবে।

মো. খুরশীদ আলমের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরান ঢাকা, হাজির বিরিয়ানি থেকে শুরু করে তার কাছের মানুষগুলোর বয়ানে তুলে আনতে চেষ্টা করেছি মানুষ খুরশীদ আলমকে। যিনি শুধু সংগীত শিল্পী নন, একজন স্বামী, একজন পিতা, সংবেদনশীল প্রতিবেশী, সজ্জন সহকর্মী ইত্যাদি নানারকম সম্পর্ক ও অসম্পর্কের লেন্সে ফেলে আঁকতে চেয়েছি প্রকৃত খুরশীদ আলমকে। আমি পেয়েছি নিরহংকারী সহজ-সরল এক মানুষের গল্প; যিনি তাঁর গান দিয়ে জয় করেছেন কোটি শ্রোতার মন। তাঁর কাছে গান আর ভালোবাসা ছাড়া দামী কিছু নেই। এই অমূল্য দুই সম্পদ পেয়েই তিনি সুখী।

মো. খুরশীদ আলমের মতো মানুষ আমাদের সংস্কৃতির অহংকার। তিনি আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ৮১ বছরে পা রেখেছেন এই গুণী শিল্পী। তার মতো আত্মত্যাগী মহান শিল্পী যতদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন, আমাদের সংস্কৃতি ততদিন শেকড়ের রসদ পাবে। এই কিংবদন্তি শিল্পীর দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights