সোনার বাংলা গড়ার নামে পরিবেশ বিপর্যয়: সাভারের কামালপুরে বন ও কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে তথাকথিত রিসোর্ট

স্টাফ রিপোর্টার: ​সাভারের ছোট কালিয়াকৈর এলাকার কামালপুরে ১৭ একর বনভূমির জমিতে “এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে কতিপয় ব্যাক্তি।
বাইরে থেকে তাদের প্রচারণা দেখে এটিকে আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ মনে হলেও গভীরে রয়েছে মারাত্মক আইনি ও পরিবেশগত ঝুঁকি।
সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রজেক্টটি বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিবেশ আইন ও সরকারি ভূমি নীতি লঙ্ঘন করে গড়ে তোলা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
​নিচে প্রজেক্টটির প্রধান প্রধান নেতিবাচক ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
​১. বন বিভাগের জমি লিজের আইনি বৈধতা ও বড় ধরনের উচ্ছেদ ঝুঁকি
​বন আইন লঙ্ঘন: বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান বন আইন অনুযায়ী, সরকারি বনভূমি বা সাব-বিটের অন্তর্ভুক্ত জমি বাণিজ্যিক রিসোর্ট, পর্যটন বা ব্যক্তিস্বার্থমূলক প্রজেক্টের জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
​চুক্তির শর্তে অসচ্ছতা: বন বিভাগের জমি সাধারণত সামাজিক বনায়ন বা নির্দিষ্ট পরিবেশগত উদ্দেশ্যে সাময়িক চুক্তিতে দেওয়া হয়। সেখানে সদস্য বা কোনো বেসরকারি স্বত্বাধিকারীর নামে বাণিজ্যিক রিসোর্ট বা পশুপালনের দোহাই দিয়ে জমি ব্যবহারের দাবি আইনি পর্যালোচনায় টিকবে না। সরকার যেকোনো মুহূর্তে এই লিজ বাতিল করে জমি পুনঃদখল করতে পারে, যার ফলে প্রজেক্টের পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।
​২. কৃষি জমি অকৃষি খাতে রূপান্তর ও পরিবেশগত ক্ষতি। রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের জন্য পাশেই ব্যক্তিগত কৃষি জমি কেনার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা দেশের “কৃষি জমি সুরক্ষা আইন”-এর চরম পরিপন্থী। উর্বর কৃষি জমিতে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে।
​ইকো-সিস্টেম বিপর্যয়: সাভারের বিরুলিয়া ও বন বিট সংলগ্ন এলাকাটি প্রাকৃতিক লেক, বনাঞ্চল ও কৃষিজমির জন্য পরিচিত। এখানে প্রতিদিন শত শত পর্যটকের সমাগম, বর্জ্য নিষ্কাশন ও শব্দদূষণ স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, পশুপাখি এবং বনাঞ্চলকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।
​৩. ​স্বচ্ছতার অভাব: মাত্র ২০টি শেয়ার বিক্রি করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রজেক্টের মোট বাজেট, লভ্যাংশ বণ্টন পদ্ধতি কিংবা জমি হস্তান্তরের কোনো স্পষ্ট ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক নেই।
​বিনিয়োগকারীদের জালিয়াতির আশঙ্কা: লিজ নেওয়া বনভূমির কোনো মালিকানা বিনিয়োগকারীদের দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোনো আইনি জটিলতায় প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা তাদের অর্থ ফেরত পাবেন না। কেবল ক্রয়কৃত সামান্য কৃষিজমির ওপর নির্ভর করে এত বড় রিসোর্ট চালানো একটি চরম অদূরদর্শী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল।
​৪. ​ভুল বার্তা ও ছদ্মবেশী পর্যটন: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকের লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবে বন ও কৃষিজমি দখল করে কৃত্রিম রিসোর্ট বানালে স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের মূল জীবিকা ও জমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
​কৃষির ক্ষতি: আধুনিক রিসোর্টের কোলাহল ও পর্যটকদের আনাগোনায় স্বাভাবিক চাষাবাদ ব্যাহত হবে এবং স্থানীয় গ্রামটির প্রাকৃতিক পরিবেশ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।

​উপসংহারে বলা যায় ​সাভার বন বিটের পাশে কামালপুরের এই এগ্রো ট্যুরিজম প্রজেক্টটি একটি আইনি জটিলতায় ঘেরা ও পরিবেশবিরোধী উদ্যোগ। বনভূমির জমিতে রিসোর্ট পরিচালনা করা যেকোনো সময় সরকারি অভিযানের মুখে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত আইনি অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়পত্র এবং স্পষ্ট আর্থিক গ্যারান্টি ছাড়া এই প্রজেক্টে শেয়ার কেনা বা বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights