হরমুজ ঘিরে নতুন অস্থিরতা : বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আলোচনায় বসার বিষয়ে কোনো পক্ষই আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে ফের বড় সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, যুদ্ধ শুরু হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এরই মধ্যে সেই আশঙ্কার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে।

বিশ্ববাজারে মঙ্গলবার জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ৯১ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ০.৭৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৫.২৫ ডলারে উঠেছে। তবে লন্ডনের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ০.৪৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮১.২৩ ডলারে নেমেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে তেলের দাম বেড়েছে ২ শতাংশের বেশি।

২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ জুন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ সাময়িকভাবে সম্মত হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর বাড়ানো হয়নি।

মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার পর ইরান জানিয়েছিল, তারা ‘পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে চলে যাবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়াতে সম্মত হয়নি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।

বর্তমানে তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় এ পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত শনিবার হরমুজ দিয়ে মাত্র পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। পরদিন রোববার কোনো তেলবাহী ট্যাংকারই প্রণালিটি ব্যবহার করেনি। অথচ তার আগের রোববার ৩১টি ট্যাংকার সেখানে চলাচল করেছিল।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ পথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার ঘটনাও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেড়ে ৪.৭২৮ শতাংশে উঠেছে। ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহারও প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫.৩১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীতি সুদের হার দীর্ঘ সময় তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে—এমন ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সম্ভাবনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারেও নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

সূত্র : রয়টার্স, আল জাজিরা ও ট্রেডিং ইকোনমিকস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights