হামাসের অস্ত্র কার হাতে যাবে?
অনলাইন ডেস্ক
গাজাকে কেন্দ্র করে ঘোষিত নতুন শান্তি উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণ শুরু করলে তাদের অস্ত্রের দায়িত্ব নেবে ‘বোর্ড অব পিস’। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা আগেই বোর্ডটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, গাজার জন্য গঠিত একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসনিক সংস্থা, ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) অস্ত্র গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে। দুই পক্ষের বক্তব্যের এই পার্থক্য পুরো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, হামাসের অস্ত্র শেষ পর্যন্ত কার কাছে যাবে। জবাবে ট্রাম্প বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ‘বোর্ড অব পিস’ পরিচালনা করবে। তবে এর আগে বোর্ড অব পিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানায়, গাজার সব বেসামরিক ও নিরাপত্তা কর্তৃত্ব এনসিএজির হাতে হস্তান্তর করা হবে এবং গাজা উপত্যকায় অস্ত্রের একমাত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে এই ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক সংস্থার কাছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষাগত পার্থক্য কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় নয় বরং পুরো শান্তি পরিকল্পনার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। কারণ হামাস বহুবার জানিয়েছে, তারা নিজেদের অস্ত্র কোনো বিদেশি শক্তির কাছে নয় বরং একটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছেই হস্তান্তর করতে রাজি। সেই অবস্থান বিবেচনায় এনসিএজির নাম উল্লেখ করা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ইসরায়েল স্টাডিজ সেন্টারের সহযোগী পরিচালক গাই জিভ বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের অভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, আরব আমেরিকানস ফর ট্রাম্পের সাবেক চেয়ারম্যান এবং অতীতে হামাস ও ট্রাম্পের আলোচক দলের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষাকারী বিশারা বাহবাহ দাবি করেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ও বোর্ড অব পিসের ঘোষণার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিরোধ নেই। তার মতে, বোর্ড অস্ত্র সংগ্রহের তদারকি করবে, কিন্তু অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখবে না। শেষ পর্যন্ত সেগুলো সম্ভবত মিশরের মতো কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে, যাতে হামাস ভবিষ্যতে আর সেগুলোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারে।
এদিকে হামাস জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তির সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। সংগঠনটির একজন প্রতিনিধি রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েল সামরিক অভিযান বন্ধ না করা, গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পণ্য প্রবেশের সুযোগ না দেওয়া এবং সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হামাস তাদের অস্ত্র পুরোপুরি ছাড়বে না। একই সময়ে গাজায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলাও অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, এ বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে তার একটি সমঝোতা রয়েছে এবং ইসরায়েল এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট। তবে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, বোর্ড অব পিসের প্রকাশিত খসড়া চুক্তি ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও পরিকল্পনাটি নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে নির্বাচন সামনে থাকায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।
বিশারা বাহবাহের মতে, এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সেই সাথে ইসরায়েলের ওপর ধারাবাহিক চাপ বজায় রাখতে হবে। তার দাবি, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু অংশ ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। তাই ট্রাম্প নিজে অগ্রাধিকার না দিলে বাস্তবায়নের পথে নানা অজুহাত সামনে আসতে পারে। অন্যদিকে গাই জিভের প্রশ্ন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, বিশেষ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তারা কী অবস্থান নেবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। সৌদি আরব একে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন এবং অবাধ মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও সফল হতে হলে সব পক্ষের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ যাচাই এবং শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর গাজা থেকে প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে কানাডাও নিরস্ত্রীকরণের ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তায় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
