৬০ কোটির সাম্রাজ্য থেকে নিঃসঙ্গ মৃত্যু: এক চিকিৎসকের করুণ পরিণতি

অনলাইন ডেস্ক
ভারতের জবলপুরের অভিজাত এলাকা রাইট টাউনের সেই বিলাসবহুল বাংলোটি আজ স্তব্ধ। যে বাড়ির প্রতিটি কোণ একসময় আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিত, আজ সেখানে কেবল পুলিশের পাহারা আর বাউন্সারদের আনাগোনা। ৮১ বছর বয়সী প্রবীণ চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডক্টর হেমলতা শ্রীবাস্তবের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। একটি প্রশ্ন উঠছে, কার হাতে যাবে তাঁর রেখে যাওয়া ৬০ কোটি টাকার এই বিপুল সম্পত্তি? নিঃসন্তান এই চিকিৎসকের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে শুরু হওয়া টানাপড়েন এখন কোনো সিনেমার থ্রিলারকেও হার মানাতে প্রস্তুত।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ জানুয়ারি, ডক্টর হেমলতার ৮১তম জন্মদিনে। ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে তাঁকে ডাক্তার সুমিত জৈন ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে হাসিমুখে কেক কাটতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এর ঠিক দুদিন পরেই নাটকীয়ভাবে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে বেশ কিছু নথিপত্রে তাঁর সই নেওয়া হয়েছিল। ডক্টর সুমিত জৈনের দাবি, হেমলতা দেবী তাঁর শ্বশুর ও ছেলের স্মৃতিতে একটি হাসপাতাল গড়ার জন্য স্বেচ্ছায় রাইট টাউনের ১১ হাজার বর্গফুট জমি দান করে গিয়েছেন। তবে এই দাবি মানতে নারাজ ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। তাঁদের অভিযোগ, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই বৃদ্ধাকে চাপ দিয়ে এবং ভুল বুঝিয়ে সম্পত্তির দলিলে সই করানো হয়েছে। এমনকি জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে যখন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন স্বয়ং হেমলতা দেবী জবানবন্দি দিয়েছিলেন যে মিথ্যে তথ্য দিয়ে ওই গিফট ডিড বা দানপত্রটি তৈরি করা হয়েছে।

বিবাদের ডালপালা এখানেই শেষ নয়। একদিকে গায়ত্রী মন্দির ট্রাস্ট দাবি করছে, হেমলতা দেবী তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তাদের ট্রাস্টকে লিখে দিতে চেয়েছিলেন, যার সমর্থনে সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাঁর ছোট বোন কনকলতা। অন্যদিকে ছত্তিশগড় থেকে আসা তাঁর আরেক বোন শান্তি মিশ্র নিজের অধিকার দাবি করে আইনি লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। এরই মাঝে জেলা কালেক্টর রাঘবেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, রাইট টাউনের এই জমিটি আসলে লিজ নেওয়া সম্পত্তি, যা আইনত কাউকে দান করা সম্ভব নয়। ফলে পুরো বিষয়টি এখন এসডিএম আদালতের বিচারাধীন।

ডক্টর হেমলতার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এই ঘটনাকে আরও করুণ করে তুলেছে। ২০২২ সালে ছেলে ডক্টর রচিতের অকাল মৃত্যু এবং গত ডিসেম্বরে স্বামীর বিয়োগের পর এই বিশাল অট্টালিকায় তিনি একেবারেই একা হয়ে পড়েছিলেন। গত বছরের নভেম্বরেও যাকে একটি চিকিৎসা সম্মেলনে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখা গিয়েছিল, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তাঁর এমন রহস্যজনক মৃত্যু শহরবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর জোরপূর্বক গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং চিকিৎসার নামে কোনো কারচুপি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে দানা বেঁধেছে গভীর সন্দেহ। জনহিতৈষী এক চিকিৎসকের জীবনপ্রদীপ নিভে গেলেও তার রেখে যাওয়া মাটির টুকরো নিয়ে শুরু হওয়া এই লড়াই এখন জবলপুরের অলিতে-গলিতে আলোচনার প্রধান খোরাক।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights