অনিয়মই যেখানে নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংকট ও অনিয়মে জর্জরিত আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে সেবার নামে উঠেছে বাণিজ্যের অভিযোগ। হাসপাতালের ক্যান্টিনের খাবারে মিলছে তেলাপোকা, রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের দেওয়া হয় নিম্নমানের খাবার। সেবার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও গত এক বছর ধরে নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় না চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের। মেডিকেল কলেজে অনুমোদন ছাড়াই বাড়ানো হচ্ছে আসন। শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষের সংকটে বিপুল অর্থ খরচ করেও মিলছে না মানসম্পন্ন শিক্ষা।

অভিযোগ অস্বীকার করে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আবদুল মান্নান বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নভেম্বর মাসের বেতনের ৬০-৭০ শতাংশ ইতোমধ্যেই সবাই পেয়েছেন। কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়তো এখনো পাননি। তবে সেটা দ্রুতই পেয়ে যাবেন। এক বছরের বেতন আটকে থাকলে তো এ প্রতিষ্ঠানে কেউ থাকতেন না। সবাই তো কাজ করছেন। এখানে প্রতিদিন ২০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। গুরুত্ব দিয়ে আমরা প্রত্যেক রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্যান্টিনের খাবার ১০০ শতাংশ মানসম্মত সেটা আমি বলব না। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি রোগীদের খাবারের মান সবসময় ঠিক রাখতে। আমি নিজেই গিয়ে দেখি।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি নথিতে হাসপাতালটিতে ৭৫০ শয্যার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে বেডের সংখ্যা মাত্র ১৪৫টি। মেডিকেল শিক্ষায় প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষকের বাধ্যবাধকতা থাকলেও আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে তার উল্টো চিত্র। প্রায় সব বিভাগেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাব, শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি রয়েছে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করেই কলেজটিতে প্রতি শিক্ষাবর্ষে আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে লাইব্রেরিতে আসন সংকট, বইয়ের ঘাটতি, মিউজিয়ামে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবসহ নানা অনিয়ম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, গত এক বছর ধরে হাসপাতাল ও কলেজে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় এসব বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। হাসপাতালটির মালিক আনোয়ার হোসেন খান নিজের স্বার্থে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কেউ মুখ খোলে না।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজনরা জানান, হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি ক্যান্টিনের খাবার নিয়েও রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। ক্যান্টিনের খাবারে তেলাপোকা ও মশামাছি পাওয়া যায়। কেক ও বিস্কুট তৈরিতে ব্যবহার করা হয় পচা ডিম। নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এই খাবার খেলে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে।

জানা যায়, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হঠাৎ করেই লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন খান। সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৫ সালে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল এবং ২০০৮ সালে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন আনোয়ার হোসেন খান। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেন। সেই অর্থের একটি অংশ শেয়ারবাজারে কারসাজিতে এবং আরেকটি অংশ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বাকি অর্থ দিয়ে দেশে জমি, বাড়িসহ বিভিন্ন সম্পত্তি কিনেছেন। বেসরকারি এ হাসপাতালের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শন ও ডিনস কমিটির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কলেজটির নামে ৮৬ দশমিক ৮৫ কাঠা জমি রেজিস্ট্রেশন রয়েছে। তবে সেই জমির নিবন্ধনের সার্টিফাইড কপি কলেজ কর্তৃপক্ষ জমা দেয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কলেজ ও হাসপাতালের নামে নিজস্ব জমি নেই। নিয়ম অনুযায়ী আরও ৭০ শতাংশ জমি কলেজের নামে কিনে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে দলিল জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তা মানা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের সুবাদে এসব অনিয়মের পরও আনোয়ার খান দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তি পেয়ে আসছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights