অন্যের প্রতি কুধারণা মনের গোপন পাপ

মুফতি মাহমুদ হাসান

বর্তমানে সর্বত্র মানুষের প্রতি মানুষের মন্দ ধারণার ছড়াছড়ি। পরিবার থেকে সমাজ এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতি সর্বত্র একে-অপরের প্রতি আস্থাহীন। দলিল-প্রমাণবিহীন মন্দ ধারণা পোষণ করা যেন একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে পড়েছে। অথচ যথাযথ প্রমাণ ছাড়া মুমিনের নিয়তের ওপর হামলা করা বা কাউকে অপবাদ দেওয়া আল্লাহর কাছে জঘন্য অপরাধ।

আম্মাজান আয়েশা (রা.)-এর ব্যাপারে মুনাফিকরা যখন অপবাদ দিল, গুটিকয়েক মুমিনও তাতে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ওই মুমিনদের সতর্ক করে বলেছিলেন : ‘আর তোমরা এমন কথা বলছিলে, যে ব্যাপারে তোমাদের কোনো জ্ঞান ছিল না; আর তোমরা এটাকে খুবই সাধারণ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর কাছে খুবই গুরুতর।’ (সুরা : নূর, আয়াত : ১৫)

মুমিনের প্রতি সুধারণা পোষণ কোরআনের নির্দেশ

আম্মাজান আয়েশা (রা.)-এর উপরোক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পরস্পর সুধারণার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যখন তোমরা এটা শুনলে, তখন কেন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা তাদের নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করল না এবং বলল না যে এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?’ (সুরা : নুর, আয়াত : ১২) এটিই একজন মুমিনের গুণ হওয়া উচিত।

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা কারো গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

মুমিনের সম্মান কাবাঘরের চেয়েও অধিক

ইবনে উমর (রা.) বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাবা শরিফ তাওয়াফ অবস্থায় কাবাঘরের প্রতি লক্ষ্য করে এ কথা বলতে শুনেছি—‘তুমি কত শ্রেষ্ঠতর! আর তোমার সুঘ্রাণ কতই না উত্তম! আর তুমি কত মহান, তোমার সম্মান কতই না মহিমাময়! তবে ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! মুমিনের জান-মালের সম্মান আল্লাহর নিকট তোমার চেয়ে অধিক, আর মুমিনের প্রতি সুধারণা ছাড়া অন্য কিছু পোষণ না করাই আল্লাহর চাওয়া।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৩২)

এ জন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছিলেন। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘তোমরা কুধারণা থেকে বিরত থাকো; কারণ কুধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথাগুলোর একটি।

আর অপরের দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না, গুপ্তচরবৃত্তি কোরো না, পরস্পর হিংসা পোষণ কোরো না, বিদ্বেষ রেখো না, সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না, বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬৪)

উক্ত হাদিসে মানুষের পেছনে লেগে থাকা বা দোষ খোঁজা ও কুধারণা পোষণ করা থেকে বেঁচে থাকার প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল বারি : ১০/৪৮২)

যাচাইবিহীন প্রচারকারীও মিথ্যাবাদীর অন্তর্ভুক্ত

কোনো কিছু শোনামাত্রই বিশ্বাস না করে তা যাচাই করা শরিয়তের নির্দেশ। যাচাই না করে কারো ব্যাপারে ধারণা পোষণ বা মন্তব্য করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে মুমিনদের সতর্ক করে বলেন : ‘হে ঈমানদাররা, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।

এ আশঙ্কায় যে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

শোনামাত্রই যাচাইবিহীন প্রচারকৃত বিষয় যদি মিথ্যা হয়, তাহলে প্রচারকারীদেরও মিথ্যা বলার গুনাহ হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট যে সে যা-ই শোনে তা (যাচাই না করে) প্রচার করতে থাকে।’ (মুকাদ্দামায়ে মুসলিম, পৃষ্ঠা-১০)

মুমিনের কাজের যথাসম্ভব সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়াই কাম্য

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমার ভাইয়ের কথা ও কাজকে তুমি ভালো ব্যাখ্যা দাও, কোনো মুমিনের মুখ থেকে যে কথা বের হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত তার ভালো ব্যাখ্যা প্রদান সম্ভব তা খারাপ দিকে টেনে নিয়ো না।’ (আত তারগিব ওয়াত তারহিব, আবুল কাসেম আসবাহানি, বর্ণনা-১৬২০)

সারকথা হলো, প্রত্যেক ব্যক্তির ধারণা তার চরিত্রেরই প্রতিনিধিত্ব করে। যে ব্যক্তি কারো প্রতি সুধারণা রাখে তা তার নিজের সুচরিত্রের প্রমাণ, আর যে সবার ব্যাপারে কুধারণা পোষণ করে এটি মূলত তার অন্তরের কদর্যতারই বহিঃপ্রকাশ। তাই আমরা কোনো মুমিনের কাজকে যথাসম্ভব ভালোর দিকে নেওয়ার চেষ্টা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights