অপরিবর্তিত নীতি সুদহার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারা বজায় রাখার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল রাজধানীর মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের সভাকক্ষে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এ সময় তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সেই গতি অত্যন্ত ধীর। ফলে এ পর্যায়ে সুদহার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে একই অবস্থায় রয়েছে। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল সরকার এলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে এ প্রত্যাশা থেকেই লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে তা দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশে। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন নাগাদ সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ। এদিকে মুদ্রা সরবরাহ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। আগামী জুনে মুদ্রা সরবরাহ ১১ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার প্রাক্কলন করা হয়েছে। গভর্নর জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৪৩০ কোটি মার্কিন ডলার কিনেছে, যার ফলে বাজারে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়তে হয়েছে। এর প্রভাবেই মুদ্রা সরবরাহ বাড়তির দিকে রয়েছে। মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়, জানুয়ারিতে টানা তৃতীয় মাসের মতো মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় : বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তে দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) হতাশা ব্যক্ত করেছে। গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করা হলেও, বাস্তব পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতির প্রয়োগ সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার বলেছে, অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসে গত ডিসেম্বরে ৬.১ শতাংশ হয়েছে। অস্বাভাবিক উচ্চ সুদের হার এবং ঋণের অতিরিক্ত ব্যয়ে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেমে ২০২৫ অর্থবছরে ২২.৪৮ শতাংশে এসেছে, যা ২০২৩ অর্থবছরে ছিল ২৪.১৮ শতাংশ। এ ধরনের অকার্যকর মুদ্রানীতির মাধ্যমে যেকোনো দেশের পক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বাস্তবসম্মত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights