‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ : ইরানের হুমকির পর চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো, বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই নতুন করে কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যে দেশগুলো যোগ দেবে, তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই। একই সঙ্গে আলোচনায় কাজ না হলে সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থে আঘাত করার কথাও বলেছেন তিনি।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার সময় এই হুঁশিয়ারি দিল তেহরান। এরই মধ্যে ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, কোনো দেশ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপে অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে ‘ভূমিকম্পের মতো’।

রেজাই আরও সতর্ক করে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করেও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। ইরান ও ওমানের মাঝ দিয়ে যাওয়া এই জলপথকে কেন্দ্র করেই চলমান সংঘাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

কী করতে পারে ইরান

মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের পদক্ষেপ কয়েক ধাপে এগোতে পারে।

প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হবে। এরপরও তারা অবস্থান পরিবর্তন না করলে আঘাত করার কথা বলেছেন রেজাই।

তিনি বলেন, প্রথমে আলোচনা হবে এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যেতে বলা হবে। তারা তা না করলে ইরান আঘাত করবে এবং ওই দেশের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, হরমুজের বিকল্প রপ্তানি পথ নিয়ে ইরানের এই হুঁশিয়ারির মধ্যে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল মান্দেব প্রণালিও থাকতে পারে। হরমুজে চলাচল সীমিত হওয়ার পর সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ তেল রপ্তানিতে বিকল্প পথ হিসেবে এই জলপথ ব্যবহার করেছে।

ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ দিয়েছে। এর ফলে তেহরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের চাপে পড়েছে।

ক্লিংডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, ইরান এখন এমন একটি প্রতিরোধ কৌশল তৈরি করছে, যেখানে কোনো সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিকেও পাল্টা পদক্ষেপের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

তার মতে, ইরানের নতুন কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে। একটি হলো সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবে পরিণত হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর চেষ্টা। অন্যটি হলো কোনো হামলা হলে তার জন্য প্রতিপক্ষকে বড় ধরনের মূল্য দিতে বাধ্য করা।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ

ইরানের এই হুঁশিয়ারির কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই অবস্থান তুলে ধরে বলেন, দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকতে হবে অথবা বিপক্ষে থাকতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের তেল কেনা চীনের কাছ থেকেও সহযোগিতা চেয়েছে ওয়াশিংটন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে রয়েছে।

তার দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল মার্কিন হামলার মুখে ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা হয়নি। বরং প্রতিরোধ, সংহতি ও ঐক্যের মাধ্যমে ইরান নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান

ইরানের হুমকির কারণে সবচেয়ে জটিল অবস্থানে রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। এসব দেশের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভৌগোলিকভাবে ইরানের খুব কাছাকাছি।

বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এসব দেশে মার্কিন সেনাও মোতায়েন আছে।

অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি রপ্তানির ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।

ইরানের হামলার কারণে এসব দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ইরানের সঙ্গে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এসব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২২ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল। সৌদি আরব ও ইরানও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়।

তবে চলমান যুদ্ধ সেই সম্পর্ককে নতুন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন মনে করেন, ভৌগোলিক বাস্তবতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে বাধ্য করবে। কারণ ইরানের পতন থেকে তৈরি হতে পারে এমন অস্থিতিশীলতা তারাও চায় না।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের ট্রিটা পারসি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে পারবে না। ফলে সংঘাত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কম থাকতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাস

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দেশটির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।

বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে এবং দেশটির প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করে। পরে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপরও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়।

১৯৯৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ করেন।

২০০৬ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে।

২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করে। চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমা আরোপের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন এবং ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। শুরু হয় তার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি।

২০১৯ সালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, ধাতু শিল্প এবং কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়ে।

জো বাইডেনের প্রশাসন ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকলেও ইরানের ওপর আরোপিত অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

এখন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এখন শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনীতি, জ্বালানি পরিবহন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানও এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তেহরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি সেই সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কাই তৈরি করছে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights