অল্প বৃষ্টিতেই ডুবছে ঢাকা

জয়শ্রী ভাদুড়ী

রাজধানীতে বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই পুরনো সমস্যা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এক থেকে দুই ঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকা। এতে যানজট, জনদুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। এই জলজটে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ পৌঁছাচ্ছে চরমে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ধানমন্ডি ২৭, গ্রিন রোড, কাঁঠালবাগান, পল্টন, মগবাজার, মতিঝিল, ফকিরাপুল, মালিবাগ, শান্তিনগর, খিলগাঁও, বাসাবোসহ অন্তত ১১টি এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাল-নালা ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচর্যার অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

গত সোমবার বিকালের এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকা, গ্রিন রোড, কলাবাগান ও কাঁঠালবাগানের বিভিন্ন সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। মতিঝিল, ফকিরাপুল ও পল্টনের বিভিন্ন সড়কেও পানি জমে ধীরগতির যানজট তৈরি হয়। মালিবাগ, মগবাজারে রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে। অফিসফেরত মানুষকে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়।

বৃষ্টির কারণে মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার কালশী মোড়ে কোমরসমান পানি দেখা যায়। নিউমার্কেট এলাকা পুরো পানির নিচে চলে যায়। ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের দোকানগুলোতেও পানি ঢুকে পড়ে। গ্রিন রোডজুড়ে পানি থইথই করার মতো দৃশ্য দেখা দেয়। পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডও পানিতে তালিয়ে যায়। কারওয়ানবাজার, শান্তিনগর, মালিবাগ, মধ্যবাড্ডা, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি ২৭, মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর ১০, ১৩, ১৪ নম্বর, সায়েদাবাদ, শনিরআখড়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, হাতিরঝিলের কিছু অংশ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত বাইপাসসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়।

কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, বৃষ্টি হলেই দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়। বাসাবো ও খিলগাঁওয়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বাসার নিচ তলা ও গ্যারেজে পানি ওঠে। জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন পথচারী, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ। সড়কে জমে থাকা পানির কারণে কোথাও কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা দেখা যায় না, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক স্থানে নোংরা পানিতে মিশে যাচ্ছে ড্রেনের বর্জ্য। ফলে চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু যাতায়াত ব্যাহত হয় না, উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়। এতে নগর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানীর প্রাকৃতিক জলাধার, খাল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। বহু এলাকায় নতুন সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও সেই অনুপাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। এ ছাড়া প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, নিউমার্কেটসহ অন্য এলাকায় দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টির পানি নামার ব্যবস্থা নেই। ড্রেনগুলো যে নালাতে যাবে, সেটার সঙ্গেও যোগাযোগের সমস্যা আছে। ড্রেন-বক্স কালভার্টে ময়লা আবর্জনায় পরিপূর্ণ। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলাবদ্ধতা সমস্যাকে শুধু মৌসুমি দুর্ভোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। রাজধানীর টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ জরুরি। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে বিভিন্ন সংস্থা হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

খাল পুনরুদ্ধার, বক্স কালভার্ট সংস্কার, পাম্প স্থাপন ও ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান থাকলেও বাস্তবে কাক্সিক্ষত সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। ২০২০ সালে রাজধানীর খাল ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বিভিন্ন খাল পুনরুদ্ধার ও ড্রেনেজ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতি বর্ষায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে পারছে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক ভারীবর্ষণ আরও বাড়তে পারে; যা রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ড্রেন পরিষ্কার বা নতুন নালা নির্মাণ করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রাজধানীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা কঠিন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights