অসম্পন্ন কাজেই কোটি কোটি টাকার বিল

ইমরান চৌধুরী

চট্টগ্রাম বন্দরের অটোমেশন প্রকল্পে কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না করেই কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা নথিপত্রে এমন একাধিক অনিয়ম ও অসংগতির চিত্র পাওয়া গেছে, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নথিপত্রে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ একটি প্রকল্পের আওতায় ১৮ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ টাকার চুক্তি করা হয় ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড’ (সিএনএস) নামক একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ।

উল্লেখ্য, এ প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ছোট ভাই। তার মৃত্যুর পর মন্ত্রীর প্রভাবেই প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে। চুক্তি অনুযায়ী- বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা ও ব্যবস্থাপনা চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। বরং হঠাৎ করে বিভিন্ন মডিউলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে উল্লেখ রয়েছে নথিতে। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে আলাদা কমিটি গঠন করতে হয়। নথি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, মেইনটেন্যান্স খাতে তিন বছরে ১১ কোটি ২৭ লাখ ৬৯ হাজার ২২০ টাকা দাবি করা হয়।

অথচ চুক্তি অনুযায়ী ৬১ জন জনবল দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়োগ দেওয়া হয় মাত্র ৪১ জন। ২০ জন কম জনবল নিয়ে কাজ চালিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ বিল দাবি করা হয়, যা নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরে গঠিত কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে ৪১ জনবলের ভিত্তিতে ৯ মাস ১২ দিনের জন্য ২ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার ২৯৬ টাকা পরিশোধযোগ্য বলে সুপারিশ করে। একই সঙ্গে মাসিক ২৬ লাখ ৩২ হাজার ৪৭৮ টাকা হারে মেইনটেন্যান্স বিল দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আসে। এ ছাড়া সিস্টেম পর্যালোচনা করে বন্দর কর্মকর্তারা দেখতে পান ২০২৫ সালের ২৮ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত মোট দুই মাস সিএনএস অটোমেশনের কার্যক্রম স্থগিত ছিল। নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, প্রকল্পের একটি ধাপে পাঁচজন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের কথা ছিল, যার ব্যয়ভার বহনের কথা ছিল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু সেই সফর বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয়নি। তার পরও ওই খাতে ব্যয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়, যা পরে সরকারি বিধি অনুযায়ী বিল থেকে কর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া একটি বিল সারসংক্ষেপে দেখা যায়, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের নামে ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৬ টাকার বিল পাস করার প্রক্রিয়া চলছে। কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া এবং সেবা বন্ধ থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এত বড় অঙ্কের বিল অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নথিপত্রে প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপের সময়সীমা নিয়েও অসংগতি পাওয়া গেছে। কোথাও সময় বাড়ানো হয়েছে, কোথাও কাজ শেষ না হলেও নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, আবার কোথাও শেষ সময় নির্ধারণ ছাড়াই কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।

বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অটোমেশন কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সব মিলিয়ে কাজ সম্পন্ন না করেই বিল আদায়, জনবল ঘাটতি গোপন রেখে অর্থ দাবি এবং না হওয়া কাজের খরচ দেখানোর মতো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে এসব নথিতে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরে এমন ঘটনার ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। তবে যেহেতু এটা সম্পূর্ণ কম্পিউটার বিভাগের অধীনে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছি।’ সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হোয়াটসঅ্যাপে নির্দিষ্ট প্রশ্ন ও কিছু ডকুমেন্ট পাঠানো হয়। এরপর দুই দিন তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন এবং কম্পিউটার বিভাগ থেকে এখনো কোনো তথ্য পাননি বলে প্রতিবেদককে জানান। সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যায়ও তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তবে সেসব প্রশ্নের উত্তর সিএনএস-এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর অটোমেশন প্রকল্পে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সিএনএস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত পাঁচটি ধাপে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী বিল গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও তদারকির মধ্য দিয়েই অর্থ পরিশোধ হয়েছে। জনবল বিষয়ে তারা জানায়, চুক্তিতে ৬১ জনের কথা থাকলেও বাস্তব প্রয়োজন ও কাজের ধরন বিবেচনায় কম জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়েছে। বিভিন্ন মডিউলের কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়ে সিএনএস বলছে, এটি স্থায়ী কোনো অবস্থা ছিল না; বরং ভবনের স্থান সংকট ও কারিগরি কারণে সাময়িকভাবে কিছু কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীতে সমস্যার সমাধান করে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। এ সময়ের জন্য বিলও সমন্বয় করে প্রদান করা হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছে। মেইনটেন্যান্স বিল অনুমোদনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, বন্দর কর্তৃপক্ষের গঠিত একাধিক কমিটি যাচাইবাছাই করে বিল অনুমোদন করেছে। সফটওয়্যার হালনাগাদ ও পরিচালনার কাজ নিয়মিতভাবে চলমান ছিল এবং এসব কাজ চুক্তির আওতায়ই সম্পন্ন হয়েছে, অতিরিক্ত কোনো অর্থ দাবি করা হয়নি। বিদেশ সফর-সংক্রান্ত প্রশ্নে সিএনএস জানায়, চুক্তিতে প্রশিক্ষণ ও সফরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবে সফর অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিল থেকে কর্তন করা হয়েছে। এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights