আইফোনেই শেষ অপ্রতিম

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

আইফোনের সন্ধান মিললেও পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হলো মায়াবী চেহারার ছোট্ট ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩)। যে নির্জীব আইফোনটি নিয়ে স্কুলের ছুটির দিনে ছবি তুলতে বেরিয়েছিল তরতাজা অপ্রতিম, সেটার লোভেই তাকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করল তার পরিচিতরা। গতকাল দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের একজন তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে কুমিল্লা গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে গতকাল স্থানীয় কবরস্থানে চোখের জলে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়। এর আগে সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তার প্রথম দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অপরদিকে হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে গতকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লা কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় মহাসড়কটি পৌনে দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন তারা। খুনিদের দ্রুত বিচার, ক্যাম্পাস এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে পরে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন। এ ছাড়া গতকাল বিকালে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার চার আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজন হলেন সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), মো. কামরুল হাসান (১৫) ও সিয়াম (১৬)। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় সে। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন এবং তার বাবা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশের একটি নির্জন স্থানে স্থানীয় কয়েকজন অপ্রতিমের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তুহিন নামে একজনকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের আটক করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকাল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে সাইফুল ইসলাম তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তিনি আরও জানান, তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ নামে একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ তার বন্ধু কামরুলের সম্পৃক্ততার কথা জানায়। পরে কামরুলকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। এতে অপ্রতিমের মৃত্যু হয়। অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার মোবাইল ফোন নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

জানাজার নামাজে কান্নায় ভেঙে পড়েন অপ্রতিমের বাবা : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গতকাল সকালে অপ্রতিমের প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পূর্বে দেওয়া বক্তব্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রতিম আপনাদের স্নেহ ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছে। সে যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে তাকে ক্ষমা কওে দেবেন। কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কান্না দেখে মুসল্লিরাও চোখ মুছতে থাকেন। ফিরোজ শাহরিয়ার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আপনাদের ছেলে আপনাদের ভালোবাসায় বড় হয়েছিল। আমি ওর বাবা হিসেবে সবার কাছে ক্ষমা চাইছি। ও যদি কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে আমার ছেলেকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তার জন্য দোয়া করবেন, যাতে আল্লাহ তার আত্মার মাগফিরাত করেন।’

অপ্রতিমকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় হাজারো মানুষ ভিড় করেন। এ সময় ছোট্ট শিশুকে হত্যার ঘটনায় অনেককে অশ্রুসজল হতে দেখা গেছে। তারা এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেন। দাফন শেষে অপ্রতীমের বাবা বলেন, ‘দ্রুত বিচার যাতে হয় বর্তমান প্রশাসনের কাছে এটা আমার চাওয়া। আমার ছেলের বয়স মাত্র ১৩ বছর, সে এ বয়সে কোনো ক্রাইম তো করবেই না, না কোনো প্রেমঘটিত কারণ থাকবে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে আনন্দে তাদের সঙ্গে যাচ্ছে সে।’

‘আমি ফাঁসি চাই না, দেশটা তলিয়ে যাক’ : একটি আইফোনের জন্য পরিচিতদের হাতে নিজের ১৩ বছরের সন্তানের নির্মমভাবে খুন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না অপ্রতীমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। সন্তানের মৃত্যুর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ফাঁসি চাই না, দেশটা তলিয়ে যাক, এ দেশটা ধ্বংস হয়ে যাক। এ দেশের দরকার নাই’। মাত্র একটা আইফোনের জন্য ছেলের হত্যাকাণ্ডের পর শোকে পাথর হয়ে গেছেন অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। বাড়িতে আসা প্রতিবেশীদের কোনো সান্ত্বনাই তাঁকে শান্ত করতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন ভেঙে পড়ছেন অপ্রতীমের মা। পাশে নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। আদরের ছোট্ট ছেলেকে এভাবে হারিয়ে নিজেই যেখানে শোকে স্তব্ধ, সেখানে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ফিরোজ শাহরিয়ারের না থাকাটাই যেন স্বাভাবিক।

অপ্রতিম হত্যায় তিন ঘাতকের স্বীকারোক্তি : অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন তিন ঘাতক। গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আবিদা সুলতানা মলির আদালতে ঘাতক তুহিন, ফাহাদ এবং কামরুল ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন। কুমিল্লা আদালতের পরিদর্শক সাদিকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে তারা তিনজনই অপ্রতিমকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। আইফোনটি দিতে রাজি না হওয়ায় অপ্রতিমের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে তার হত্যা নিশ্চিত করা হয়। তিন ঘাতকই আদালতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে এর দায় স্বীকার করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights