আগেই সতর্ক করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ওয়াজেদ হীরা
সচিবালয়ে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার খবর আগেই ছিল সরকারের কাছে। সে কারণে আগুনের ঘটনার ১ মাস ২২ দিন আগে একটি সতর্কীকরণ নির্দেশনা জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারপরেও কেমন করে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো, কেন এত বড় আগুনের ঘটনা ঘটল এ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।

আগুনের ঘটনার পর নিরাপত্তা বিবেচনা করে সচিবালয়ে আগুনের ঘটনার পর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। সচিবালয় হচ্ছে কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) প্রতিষ্ঠান। কেপিআই নীতিমালায় বলা হয়েছে, কেপিআই হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা কারখানা বা জনস্বার্থে ব্যবহৃত স্থাপনা যেগুলো দেশের যুদ্ধ সামর্থ্য অথবা জাতীয় অর্থনীতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং যা ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের যুদ্ধ কিংবা প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বা জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেপিআই চত্বরে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন এবং এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিকটতম ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে ন্যূনতম বছরে দুবার মহড়া করবে, প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সংযোগ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হয়। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা রাখার কথা রয়েছে নীতিমালায়। অথচ সচিবালয়ের আগুন জ্বলেছে ৬ ঘণ্টা ধরে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের পুরো আগুন নেভাতে সময় লেগেছে ১০ ঘণ্টা। এই আগুন লাগা দুর্ঘটনা নাকি ইচ্ছাকৃত সেটি এখনো জানা যায়নি। সরকার গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি আজই প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, সচিবালয়ে আগুনের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তদন্তের স্বার্থে আলামত প্রয়োজনে বিদেশেও পাঠানো হতে পারে।

সচিবালয়ের নিরাপত্তা বিঘিœতের আশঙ্কা করে জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে গত ৩ নভেম্বর সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একটি চিঠি দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই চিঠির কপি রয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে। নির্ধারিত সময় (বিকাল ৫টা) পর অফিস খোলা রাখার প্রয়োজন হলে আগেই জননিরাপত্তা বিভাগকে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয় সে চিঠিতে। যদিও যে রাতে আগুন লেগেছিল আগের দিন বড়দিনের ছুটি ছিল। ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভ্যন্তরে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নির্ধারিত অফিস সময়ের পরও সচিবালয়ের অভ্যন্তরে মন্ত্রণালয়/বিভাগের অফিস কক্ষ খোলা রেখে কাজ করলে নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায়, সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে নির্ধারিত অফিস সময়ের পর জরুরি বা বিশেষ প্রয়োজনে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত মন্ত্রণালয়/বিভাগের কোনো অফিস কক্ষ খোলা রাখার প্রয়োজন হলে আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগকে লিখিতভাবে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ কেন এই চিঠি ইস্যু করা হয়েছিল জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সিনিয়র স্যারদের নির্দেশক্রমে এই চিঠি সে সময় আমরা পাঠিয়েছিলাম সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করে, সচিবালয়ের ভিতরে বাইরে কয়েকস্তরে নিরাপত্তা থাকে। এমন চিঠি ইস্যু হয়েছিল কারণ তখন রাতেও অনেক ভবনের রুমগুলোতে আলো জ্বলত। এদিকে, একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সচিবালয়ে কিছু মানুষের যাতায়াত বেড়েছিল। বিশেষ করে বিকালের দিকে এবং সন্ধ্যার পরও অনেকেই গাড়িতে করে প্রবেশ করতেন সচিবালয়ে। তারা কারা, কেনই বা সচিবালয়ে অফিস শেষের দিকে আসতেন সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির এক সদস্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা তিনটি বৈঠক করেছি। সোমবারও বৈঠক হবে। আমরা পোড়াভবন কয়েকবার ঘুরে খুঁটিনাটি দেখেছি। সিসি ক্যামেরা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ওই সদস্য আরও বলেন, সব তথ্যই আমরা প্রতিবেদনে দেব। ভবনে অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা। ফলে কিছু নষ্ট থাকতে পারে সেগুলো পেয়েছি সেসব নিয়ে কাজ হচ্ছে। সব এঙ্গেল থেকে আমরা কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। গত ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর বৃহস্পতিবার অফিস খোলা থাকলেও খুব একটা কাজ হয়নি সচিবালয়ে। গতকাল ছিল সপ্তাহের প্রথম কর্ম দিবসে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অফিস করছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

উপদেষ্টা, সচিব এবং সংস্থা প্রধান ছাড়া অন্য কারও গাড়ি সচিবালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত সচিব থেকে নিচের দিকের কর্মকর্তারা প্রবেশ পথে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছেন। আর জরুরি দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবদুল গনি রোডে পৃথক বুথ চালু করা হয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীরাও আপাতত সচিবালয়ে ঢুকতে পারছেন না। দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কেবলমাত্র স্মার্ট কার্ডধারী সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রবেশ করতে পারছেন। অন্য কোনো ধরনের ভিজিটর বা সাংবাদিক কেউই এখান দিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই। সচিবালয়ে গাড়ি ঢুকতে না দেওয়ার কারণে আশপাশে পার্কিং নিয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights