আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ?
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে- এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলো গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় সংকট নিরসনের সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব এবং ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা। অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়ে হুথিরা সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থবির কূটনৈতিক উদ্যোগ
সংঘাত থামাতে পাকিস্তান ও কাতার সম্প্রতি তেহরানে একাধিক কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালালেও তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মধ্যে এখন হতাশাই বেশি।
পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে, কারণ সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় কাতারও দুই দফা হামলার শিকার হয়েছে।
ওমান ও হরমুজেও উত্তেজনা
ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানি ড্রোন দেশটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজেও হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এসব ঘটনার ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে সেখানে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের হুঁশিয়ারি
ইরান বারবার সতর্ক করে বলেছে, যেসব প্রতিবেশী দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, প্রয়োজন হলে সেসব দেশেও হামলার পরিধি বাড়ানো হবে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ সম্প্রতি বাহরাইন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা হলে এসব বন্দরও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
অবকাঠামোয় হামলা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, টানেল, সড়ক, সেতু এবং রেলপথও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর হামলা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং এর ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিটি হামলার জবাবে আরও বড় পাল্টা হামলা
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, প্রতিটি মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ইরান আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। উভয় পক্ষই প্রতিটি সংঘর্ষের মাধ্যমে নতুন প্রতিরোধ সক্ষমতার বার্তা দিতে চাইছে।
তার ভাষায়, “প্রতিটি মার্কিন উত্তেজনার জবাবে ইরানও উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। উভয় পক্ষই প্রতিটি পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে নতুন প্রতিরোধের সীমা নির্ধারণ করতে চাইছে।”
তিনি আরও সতর্ক করেন, এই সংঘাত ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা উভয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
তার মতে, সংঘাত যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগও দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উপসাগরীয় দেশ, ইয়েমেন, হরমুজ প্রণালী এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও এর সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়েছে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। সূত্র: সিএনএন
