আড়ালে থেকেও রণকৌশল সাজাচ্ছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা: মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্যে ইরানের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছেই না। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে না এলেও পর্দার আড়ালে থেকে দেশটির যুদ্ধ কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে যুদ্ধের শুরুতে যে হামলায় তার বাবা এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হয়েছিলেন, সেই হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবার শারীরিক অবস্থা এবং প্রকৃত কর্তৃত্ব নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনের অন্দরেই নানা প্রশ্ন দানা বাঁধছে।

মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, একটি ‘ছিন্নভিন্ন’ হয়ে যাওয়া শাসনের মধ্যে ক্ষমতার লাগাম কার হাতে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

মোজতবা খামেনির রহস্যময় ভূমিকা ও কঠোর গোপনীয়তা

যুদ্ধের একদম শুরুর দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি অভিযানে মোজতবা খামেনি শরীরের একপাশে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, তার মুখমণ্ডল, হাত, ধড় এবং পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি বর্তমানে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। মজার বিষয় হলো, নিরাপত্তার খাতিরে বা শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন না। তার সমস্ত নির্দেশ কেবল সরাসরি সাক্ষাতে আসা বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কাছে মৌখিকভাবে দেওয়া হচ্ছে অথবা বার্তাবাহকের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হচ্ছে। এই কঠোর গোপনীয়তার ফলে মার্কিন গোয়েন্দা মহলে তার অবস্থান ‘উইজার্ড অব ওজ’ সিনেমার সেই অদৃশ্য জাদুকরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে সবাই অনুভব করতে পারছে কিন্তু কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

যদিও তেহরানের পক্ষ থেকে মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করা হচ্ছে। গত শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের প্রটোকল প্রধান মাজাহের হোসেইনি এক জনসভায় দাবি করেছেন যে, মোজতবা খামেনি এখন ‘সম্পূর্ণ সুস্থ’। হোসেইনির ভাষ্যমতে, তার পায়ে ও পিঠের নিচে সামান্য চোট ছিল এবং কানের পেছনে একটি ছোট শার্পনেল লেগেছিল, যা এখন সেরে গেছে। তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে, সঠিক সময়েই সর্বোচ্চ নেতা দেশবাসীর সামনে ভাষণ দেবেন। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, তিনি মোজতবার সঙ্গে আড়াই ঘণ্টার একটি দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। এটিই ছিল নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে কোনো শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারের খবর, যা তার রাজনৈতিক সক্রিয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।

ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতা

মোজতবা খামেনির এই ‘অদৃশ্য’ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল মার্কিন প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সরাসরিই বলেছেন যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত খণ্ডিত এবং বিশৃঙ্খল। এই অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আবার মনে করছেন, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর কিছু অংশ হয়তো মোজতবার নাম ব্যবহার করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, কারণ আড়ালে থাকা নেতার নামে যেকোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া সহজ।

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরান বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হলেও গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লঞ্চার এখনো অক্ষত রয়েছে। চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে ইরান তাদের মাটির নিচে চাপা পড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জামগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। সিআইএ-র একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতি ধুঁকলেও দেশটি আরও অন্তত চার মাস এই অবস্থা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন যে, ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’র চাপে ইরান দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং তাদের নৌবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিকল্প নেতৃত্ব ও ঘালিবাফের উত্থান

ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে আসছিল যে, ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে এবং বর্তমান নেতৃত্ব অনেক বেশি ‘যৌক্তিক’। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ মনে করেন, ইরানি আলোচকরা মোজতবাকে একটি ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। আলোচনার যেকোনো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তের দায় মোজতবার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তারা অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থী সমালোচনা থেকে নিজেদের রক্ষা করছেন। তার মতে, মোজতবা হয়তো যুদ্ধের দৈনন্দিন কৌশল নির্ধারণে খুব একটা যুক্ত নন, কিন্তু বড় ধরনের কোনো প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি ইরানের কূটনীতির একটি সুপরিকল্পিত অংশ।

মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরানের দৈনন্দিন শাসনকাজ এবং সামরিক কার্যক্রম মূলত সামলাচ্ছেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। ঘালিবাফ বর্তমানে ইরানের রাজনীতির এক শক্তিশালী মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি একদিকে যেমন কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন, অন্যদিকে সেনার পোশাক পরে রণক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিতে দক্ষ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার পর ঘালিবাফকে একজন নির্ভরযোগ্য এবং প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার প্রথম পর্বে ঘালিবাফই ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যা তার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার প্রমাণ দেয়।

কূটনৈতিক জটিলতা ও ট্রাম্প প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ

ট্রাম্প প্রশাসন যখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মরিয়া, তখন ইরানের অভ্যন্তরে ক্ষমতার এই ভাঙাগড়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক আগেই সতর্ক করেছিল যে, পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলেও তার উত্তরসূরিরা কঠোরপন্থীই হবেন এবং মূলত আইআরজিসি-র নিয়ন্ত্রণেই থাকবে দেশ। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয়েছে। মোজতবা খামেনি হোক বা ঘালিবাফ—ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব মার্কিন চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে বরং অবরোধের মধ্যেই টিকে থাকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। এই অনিশ্চয়তা ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্যের পথে এক বিশাল অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চললেও ওই জলপথে দুই দেশের সেনাবাহিনী মাঝেমধ্যেই একে অপরের ওপর গুলি চালাচ্ছে। ইরান দাবি করছে যে তারা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবরোধ কঠোরতর করছে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইরান তাদের জনগণকে অভুক্ত রেখে হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার মানসিকতা দেখাচ্ছে। সিআইএ-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও তারা এখনো পরাজয় মেনে নেওয়ার মতো অবস্থানে নেই। ফলে যুদ্ধের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে জয়ী হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

দীর্ঘস্থায়ী ‘শীতল যুদ্ধের’ পথে ইরান

মোজতবা খামেনির রহস্যময় অন্তর্ধান এবং আড়ালে থেকে শাসন পরিচালনার এই কৌশল ইরানকে এক নতুন ধরনের ‘শীতল যুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন তার শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে যত বেশি সন্দেহ প্রকাশ করছে, তেহরান তত বেশি প্রচারণার মাধ্যমে তার সুস্থতার কথা জানান দিচ্ছে। তবে খামেনি পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা কতটা কার্যকরভাবে আইআরজিসি এবং রাজনৈতিক আমলাতন্ত্রকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে পারবেন, তা কেবল সময়ই বলবে। আপাতত, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ধোঁয়াশা আর ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রচারণার লড়াইয়ের মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চিত পেন্ডুলামের মতো দুলছে, যেখানে পর্দার আড়ালের মানুষটিই তাসের শেষ চালটি দিচ্ছেন।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights