আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা
সৈয়দা আইরিন জামান
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি! আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা এবং আলতাফ মাহমুদের সুরারোপিত গানটি এখন পৃথিবীব্যাপী রণিত এবং অনুরণিত হচ্ছে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। ২০০২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি স্বীকৃতি লাভ করে। জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়েছে, এ দিবস ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের মানুষের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের স্বীকৃতি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বহুভাষিকতা প্রচারের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী পালিত একটি বার্ষিক দিবস।
‘The Mother language Lovers of the World’-এর প্রতিষ্ঠাতা কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম। তারা জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিবের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার আবেদন জানান। তাদের প্রচেষ্টায় এবং বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৯৯ সালে Unesco বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে দিবসটি ঘোষণা করে।
এ ঘোষণায় বিশ্বের সব মাতৃভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো সদর দপ্তরসহ ১৯৪টি দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি এ কারণেই বাঙালি জাতির ইতিহাসে গৌরবময়, অনুপম এবং অবিস্মরণীয়। জাতীয় ভাবাবেগে এবং জাতীয় চেতনায় বাঙালির সঙ্গে সম্পৃক্ত শহীদ দিবস কিংবা ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি ভাষার জন্য আত্মদানের মধ্যেই নিহিত। ভাষার জন্য প্রাণদান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। উপনিবেশিক শাসন কিংবা সৈ¦রশাসনের কারণে পৃথিবীতে অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে। যেমন কলোনিয়াল আগ্রাসনের কারণে মিসরের আদি ভাষা এখন বিলুপ্ত। বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সংগঠিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে পূর্ব বাংলায় মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে তদানীন্তন পাকিস্তান অধিরাজ্যের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও বস্তুত, এর বীজ রোপিত হয়েছিল বহু পূর্বে। অন্যদিকে এ প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাংলায় শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের দাবি জানালে তা অগ্রাহ্য হন।
প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষার দাবিতে আট দফা দাবি পেশ করে। ৬৯ জনকে গ্রেপ্তারের ফলে ১৩ থেকে ১৫ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৫ মার্চ আট দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। একই ঘোষণা ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দিলে ছাত্ররা ‘না’ ‘না’ বলে চরম প্রতিবাদ জানায়।
২৮ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা ত্যাগ করেন এবং সেদিন সন্ধ্যায় রেডিওতে দেওয়া ভাষণে তার পূর্বেকার অবস্থানের কথায় পুনর্ব্যক্ত করেন। ভাষা আন্দোলনের মতো মৌলিক অধিকারের বিষয়টি পুনরায় বলিষ্ঠ হওয়ার পেছনে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ওই দিন তিনি পল্টন ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কথাই পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা ভাঙার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে নিহত হন।
ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার নতি স্বীকার করে এবং ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লিখিত হয়।
বাঙালির ব্যক্তিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের ত্যাগের মহিমায় এ মাসেই ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বেসামরিক পদক ‘একুশে পদক’।
১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের মহিমান্বিত ইতিহাসের পরম্পরায় রচিত হয়েছে কালজয়ী কবিতা, নাটক, উপন্যাস, চলচ্চিত্র, চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্য।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি পেয়েছে কাক্সিক্ষত একটি রাষ্ট্র এবং লাল, সবুজে খচিত প্রাণের পতাকা।
