আপসে থমকে যায় বিচার

মাহবুব মমতাজী

থাইল্যান্ডের গহিন অরণ্যে গণকবর পাওয়া গিয়েছিল ২০১৫ সালের ১ মে। তারপর মালয়েশিয়াতেও পাওয়া যায়। এরপর খোঁজ মেলে নির্যাতন শিবিরের। এরপর থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে মানব পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার ১৭৫ জনকে সরকার দেশে ফিরিয়ে আনে একই বছর। মামলা হয় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে নয়টি বছর- কিন্তু ওই পাচারকারীদের বিচারে কোনো অগ্রগতি নেই। নানা কারণে থমকে আছে বিচারকাজ। আবার কিছু মানব পাচারকারী ইউরোপে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে মানুষকে লিবিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে তারা অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া লিবিয়া থেকে ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকের সলিল সমাধি হয়েছে। এসব মৃত্যুর ঘটনায়ও মামলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তও হয়; কিন্তু বিচার আর এগোয় না।

শুধু পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪টি মামলার বিচার হয়েছে। এতে সাজা হয়েছে মাত্র ২৫ জনের। সাক্ষীর অভাবে খালাস পেয়ে গেছেন ৩৪৫ জন। অথচ ওই বছর ১ হাজার ১৯৬ জনকে পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছিল ৬৯৭টি। মামলার সূত্র ধরে উদ্ধার হয় ৮৯৯ জন ভুক্তভোগী। পাচারে জড়িত থাকায় অভিযুক্ত করা হয় ২ হাজার ৯৭৫ জনকে, গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ৬১৯ জনকে।

আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৪ সালের ১৫ জুন থেকে গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মানব পাচারের ঘটনায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ১৪ হাজার ৫৩৮ জনকে। এ সময় মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৫১৭টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৪৭টি মামলা। বিচারে মৃত্যুদ হয়েছে আটজনের, যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে ২৯৯ জনের এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ১২৭ জনের। মামলা নিষ্পত্তির হারই খুবই কম। মানব পাচারের মামলা থেমে থাকার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, কক্সবাজারের রামু উপজেলার ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরীকে নেপালে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়েছিল মানব পাচারকারীরা। ২০১৪ সালের আগস্টে তাদের খপ্পরে পড়ে ওই কিশোরীর ঠাই হয় খুলনার একটি যৌনপল্লিতে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। পাঁচ মাস পর ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিন মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে রামু থানায় একটি মামলা করে মেয়ের পরিবার। ওই বছরের অক্টোবরে তিনজনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিচার দূরে থাক, আসামিদের কেউ ধরাই পড়েননি। ওই মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামসুল হক জানান, মামলাটি এখনো সাক্ষী পর্যায়ে। দীর্ঘদিন মামলাটি বিচারাধীন থাকায় ভুক্তভোগী হতাশ হয়ে আর মামলার খোঁজ রাখেন না। মামলার সাক্ষীদেরও পাওয়া যাচ্ছে না। কক্সবাজারে নোঙর নামে একটি এনজিওর তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের আদালতে এখন পর্যন্ত ৪৬৭টির বেশি মামলা বিচারাধীন আছে। ২০২১ সালের ১৯ মে মাদারীপুরের রাজৈর থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী নারী। মামলায় আসামি করা হয় রফিকুল শেখ, রাঙ্গা শেখ ও শিবলী ফকির নামে তিনজনকে। মামলাটির বিষয়ে মাদারীপুরের আদালত সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ও ৭ নভেম্বর মামলার বাদী এবং আসামিরা আপস করে আদালতে আপসনামা দাখিল করেন। একই সঙ্গে আদালতে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের আবেদন করেন। মামলাটি তদন্ত করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বেশির ভাগ মামলায় আসামিরা টাকা-পয়সা দিয়ে বাদীর সঙ্গে আপস করেন। পরে আদালতে গিয়ে মামলার আর কোনো খোঁজ রাখেন না, সাক্ষীও দেন না। যে কারণে ঝুলে যায় মামলার বিচার। তবে আইনে এ মামলায় আপস করার কোনো সুযোগ নেই। মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আজাদ রহমান এ প্রতিবেদককে জানান, অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরাও আসামিদের সঙ্গে আপস করার কারণে মামলার তদন্ত কিংবা বিচারে সহযোগিতা করেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights