‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি শুধু এটুকু জানতে চাই’

অনলাইন ডেস্ক

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক ড. নাহিদা বেগম। ১৩ বছরের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর বারবার একই প্রশ্ন করছেন তিনি, তাঁর সন্তানের অপরাধটা কী ছিল?

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি জানতে চাই। আমাকে জবাব দেন। আমি কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি শুধু এটুকু জানতে চাই। আমি কোন দেশে থাকি, এটা কোন দেশ? একটা ছেলে বাসা থেকে বের হবে, তাকে মেরে ফেলবে!’

ছেলের এমন পরিণতি মেনে নিতে না পেরে বারবার বিলাপ করছিলেন এই মা। একপর্যায়ে বলেন, ‘আমি বাঁচব কীভাবে? আমার জীবনটা কীভাবে পার করব? আমার একমাত্র ছেলে। আমি কেমনে বাঁচব?’

শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের মুঠোফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তার মুঠোফোনের অবস্থান গন্ধমতী এলাকায় পাওয়া গেলেও পরে সেটির আর কোনো অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।

ছেলের খোঁজ না পেয়ে রাতে সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি অপ্রতিমের বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।

শনিবার দুপুরে ক্যাম্পাসের কাছের লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন।

অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান সে।

ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় বাবাও ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের একটাই ছেলে। অন্যায় করলে ওরে মেরে ফেল, অন্যায় করে নাই। ওর ফোন নিয়ে… ফোনটা নেওয়ার জন্য ওকে মেরে ফেলল, এটা কী হলো? ফোনের দাম আছে, একটা মানুষের দাম নেই?’

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মুঠোফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেকটা নিশ্চিত, মোবাইল ফোনের জন্যই এ হত্যার ঘটনা।’

এ ঘটনায় তুহিন নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মহিবুল আলম ভুঁইয়া জানান, তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তুহিনের বাড়ি সানন্দা এলাকায়, তাঁর বাবার নাম নুরুল আলম।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে একজন আছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমি এখান থেকে যাওয়ার পর বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখব, তদন্ত করব। প্রকৃত হত্যাকারী না ধরা পর্যন্ত আমরা ননস্টপ এটা নিয়ে কাজ করব।’

অপ্রতিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে শনিবার তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। শোকাহত মা-বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় তিনিও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

মায়ের কান্না শুনে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।’ পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এ এলাকার এমপি হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত। এক মাসুম বাচ্চাকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। ৯০ দিনের মধ্যে এ ঘটনার বিচার শেষ করতে হবে।’

এদিকে অপ্রতিম হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে শনিবার বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights