আমেরিকার হঠাৎ হামলা ঠেকাতে মরুভূমিতে চীনের মহাযজ্ঞ

চীনের প্রত্যন্ত জিনজিয়াং প্রদেশের মরুভূমিতে গড়ে উঠছে বিশাল ও অভূতপূর্ব সামরিক বলয়। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ছবি বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নিজেদের পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো বা ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষিত করতে বেইজিং সেখানে একের পর এক লঞ্চ প্যাড, বাঙ্কার এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকার সম্ভাব্য যেকোনো আকস্মিক হামলা থেকে নিজেদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার রক্ষা করতেই বেইজিংয়ের এই বিশাল আয়োজন, যাতে আক্রান্ত হলেও চীন যেন নিশ্চিতভাবে পাল্টা আঘাত হানতে পারে।

বর্তমানে চীনের পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আমেরিকার যেকোনো শহরে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে নিজেদের এই সক্ষমতাকে আরও নিটোল করতে তারা জিনজিয়াংয়ের হামি ক্ষেপণাস্ত্র সাইলোর কাছাকাছি এলাকায় এই নতুন অবকাঠামো তৈরি করছে। স্যাটেলাইট চিত্রে মরুভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অন্তত ৮০টি নতুন লঞ্চ প্যাড দেখা গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এগুলো মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করা হবে। একই সাথে সেখানে ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল ও স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য বিশেষ স্থাপনাও তৈরি করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা গবেষকরা জানিয়েছেন, এই নতুন সামরিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গত ছয় বছরে তৈরি হওয়া দুটি অষ্টভুজাকৃতির বিশাল স্থাপনা। এই অক্টাগনগুলোর ভেতরে সেনা সদস্যদের আবাসন এবং বড় সামরিক যান রাখার ব্যবস্থার পাশাপাশি চারপাশ ঘিরে রয়েছে সুরক্ষিত বাঙ্কার, অস্ত্রাগার, বিমান উড্ডয়ন পথ এবং রেললাইন। অতি সম্প্রতি গত এপ্রিল ও মে মাসেও এই অক্টাগনগুলোর চারপাশে বড় বড় সামরিক যানের মহড়া এবং ছদ্মাবরণে ঢাকা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির উপস্থিতি ধরা পড়েছে স্যাটেলাইটে। প্রতিটি অক্টাগন থেকে শত শত কিলোমিটার বিস্তৃত মাটির রাস্তা এবং গোপন সংযোগ লাইন মরুভূমির ভেতরের কংক্রিট প্যাডগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে, যা সম্ভবত ফাইবার অপটিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ।

ওয়াশিংটন ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীন এখন দ্রুত গতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বেইজিংয়ের পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছাতে পারে। যদিও চীনের আনুষ্ঠানিক সামরিক নীতি হলো তারা কখনো প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে না, তবে তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকার সাথে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মুখে নিজেদের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে মরিয়া বেইজিং।

বিশ্বের অন্য দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া তাদের পরমাণু সাইলো সুরক্ষায় মূলত ভৌগোলিক দূরত্ব এবং কাঠামোগত দৃঢ়তার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু চীন যেভাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষায় চারপাশে এক বিশাল প্রতিরক্ষামূলক জাল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র পর্যবেক্ষণ করা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরুভূমির চরম প্রতিকূল পরিবেশে এত বিশাল আকারের সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের ঘটনা তারা এর আগে কখনো দেখেননি। বেইজিংয়ের এই গোপন ও নজিরবিহীন পরমাণু কর্মযজ্ঞ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights