আলোচনায় ছিল বিচার বিভাগ
আরাফাত মুন্না
২০২৫ সাল বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য ছিল ঘটনাবহুল, সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একের পর এক রায়, বিচারিক সংস্কারের উদ্যোগ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিকভাবে আলোচিত মামলাগুলো বিচার বিভাগকে রেখেছে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কখনো আশার আলো, কখনো বিতর্ক সব মিলিয়ে বিচার বিভাগে এটি ছিল এক গভীর রূপান্তরের বছর। চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, গুমের মামলায় সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা। এ ছাড়া সংস্কার ও একযোগে বড়সংখ্যক বিচারকের পদোন্নতির ঘটনাও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদায়ি বছরে দেশের ইতিহাসে উচ্চ আদালতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিচারক নিয়োগে অধ্যাদেশ ও হাই কোর্টে বিচারপতি নিয়োগে প্রথমবারের মতো আবেদন আহ্বান করা হয়েছে এ বছরই। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা তথা বছরের শেষ দিকে এসে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসা ছিল বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীক হারানোর পর আবার সেটি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে ফিরে পাওয়া, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মামলা থেকে খালাস দেওয়াসহ আদালতে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড : ইতিহাসের নজির : ২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও যুগান্তকারী ঘটনা ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, দমনপীড়নের ঘটনায় সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। দেশের ইতিহাসে কোনো সরকারপ্রধানের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।
রায়ে ফিরেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা : চলতি বছর আপিল বিভাগের রায়ে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল হয়েছে। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে এ ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না। পরবর্তী সংসদ নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে। ২০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন।
অধ্যাদেশ হয়েছে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে : সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে। এ নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে চলতি বছরেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এতে বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব পাঠাতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ অধ্যাদেশ জারির পর হাই কোর্ট বিভাগে একসঙ্গে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক (২৫ জন) অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগ দিতে নিয়োগপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে গণবিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট, এটাও দেশে প্রথম।
বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতায় পৃথক সচিবালয় : ৩০ নভেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এ অধ্যাদেশে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করবেন। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও হয়েছে। ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪-এ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
খালেদা জিয়ার খালাসের রায় আপিলেও বহাল : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাই কোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা তিনটি লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) খারিজ করে ৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
১০ বছরের সাজা থেকে খালাস পান তারেক রহমান : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ১০ বছরের সাজা থেকে খালাস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে বিচারিক আদালতের সাজাও বাতিল করা হয়েছে। তিনজনের করা আপিল গ্রহণ করে ১৫ জানুয়ারি এ রায় দেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ। রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ছেলে তারেক রহমানসহ সবাই খালাস পেয়েছেন। এদিকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এক মামলায় স্ত্রী জুবায়দা রহমানের সঙ্গে এক মামলায় তারেক রহমানও খালাস পেয়েছেন। আলোচিত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়ও তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাই কোর্ট। পরে আপিল বিভাগ সে রায় বহাল রেখেছেন।
মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পান এ টি এম আজহার : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস দিয়ে রায় ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আজহারের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে ২৭ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
