ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি আলোচনা আটকে আছে একটি পরমাণু কেন্দ্রে?

অনলাইন ডেস্ক

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই চুক্তির আটকে আছে কিছু বিষয়ে, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের বৃহত্তম জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সম্প্রতি ফ্লোরিডায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকে ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে এই কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ পরিচালনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

২০২২ সালের মার্চ মাস থেকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে সম্মুখ সমরের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত হওয়ায় এর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে জেলেনস্কি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছেন। তাতে একজন মার্কিন প্রধান ব্যবস্থাপকের অধীনে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় যৌথ পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেবে খোদ যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে, রুশ সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্যমতে, রাশিয়াও এই কেন্দ্রটি যৌথভাবে পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করছে। মার-আ-লাগোতে আলোচনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভাগ্য নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং যুদ্ধের মাঝেও কেন্দ্রটিতে বড় ধরনের কোনো ধ্বংসযজ্ঞ না হওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

বর্তমানে দিনিপ্রো নদীর তীরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখলেও পারমাণবিক জ্বালানি শীতল রাখতে বাইরের বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। যুদ্ধের প্রভাবে গত কয়েক বছরে এই সংযোগ অন্তত ১১ বার বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বারবার সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে অবস্থিত পারমাণবিক কেন্দ্রটির নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ফলে কেন্দ্রটি শীতল করার জন্য প্রয়োজনীয় পানির উৎস কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

জাপোরিঝিয়া কেন্দ্রটি দখলের পেছনে মস্কোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ করা। অন্যদিকে, রুশ হামলায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো বিধ্বস্ত হওয়া ইউক্রেনের জন্যও এই কেন্দ্রটি ফিরে পাওয়া অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন বর্তমানে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতিতে রয়েছে, তা জাপোরিঝিয়ার চারটি চুল্লি সচল করলেই পূরণ করা সম্ভব। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও কারিগরি সমস্যার কারণে কেন্দ্রটি পুরোপুরি সচল করতে দুই থেকে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির প্রকৃত অবস্থা কেমন বা এর যন্ত্রপাতি কতটা সচল আছে, সে সম্পর্কে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছানোই এখন শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে রাশিয়া এই কেন্দ্রের ওপর নিজেদের পূর্ণ মালিকানা দাবি করছে, অন্যদিকে ইউক্রেন এটিকে তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights