“ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন ফ্লোটিলা”

হাসিনা মরিয়ম

সুমুদ শব্দের অর্থ অটলতা বা অবিচল বা সহনশীলতা,সুমুদ গ্লোবাল ফ্লোটিলা ৫০টি জাহাজ, ৪৪টিরও বেশি দেশের প্রায় ৫০০ অংশগ্রহনকারী যোগ দেন, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাগরিক নেতৃত্বাধীন নৌবহর হিসেবে পরিচিত, এই উদ্যোগটি ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন, গ্লোবাল মুভমেন্ট টু গাজা,এর যৌথ আয়োজনে গাজা যুদ্ধের সময় শুরু হয়, এখানে পলিটিকাল, এক্টিভিটিস,হলিউড তারকা সহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, ওনারা হতভাগ্য গাজাবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ ও খাবার নিয়ে যাচ্ছেন, ওনাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই, মানবিক বিবেকের তাড়নায় গাজাবাসীর পাশে দাড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পৌঁছার আগেই ইসরায়েল হামলা করে ফ্লোটিলার উপর, গাজার কাছাকাছি যাওয়ার পর ইসরায়েলের সৈন্যরা সবগুলো জাহাজ ও যাত্রীদের আটক করে ইসরায়েলের শহর আসদোদ এ নিয়ে যায়, এর প্রতিবাদে সারা দুনিয়া বিক্ষোভে ফেটে পড়ে,

কিন্তু এটা কোন প্রথমবার ফ্লোটিলা না যে ইসরায়েল আটক করেছে, এর আগে ও ১০ টা ফ্লোটিলা ইসরায়েল আটক করেছে, এখন প্রশ্ন হলো এই ফ্লোটিলার কনসেপ্ট কোথা থেকে এসেছে,

মাইকেল শেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক, আজ থেকে ২০ বছর আগে যখন সে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিলিস্তিন গিয়েছে, তখন সে হতবাক হয়ে গেছে, ইসরায়েল গাজাবাসীকে ঘিরে রেখে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জেলখানা বানিয়ে খাবার ও পানি না দিয়ে তিলে তিলে না খাইয়ে মারছে, মাইকেল এদের করুণ অবস্থা দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং সারা দুনিয়াকে এই দূরাবস্থার কথা জানায়,আর তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্ধ হয়ে তাকে বন্দী করে ইসরায়েলের কারাগারে প্রেরণ করে,
মাইকেল শেন তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছে জেলে থাকা অবস্থায় সে চিন্তা করলো ইসরায়েল তাকে আর কখনও গাজা আসার অনুমতি দিবে না, তখন উনি ভাবলেন যদি সারা দুনিয়া থেকে অনেক মানুষ নিয়ে অনেক নৌকার সারি নিয়ে গাজায় রওয়ানা দিলে ইসরায়েল কিছু করতে পারবে না, যদি ইসরায়েল আটকায় তাহলে সারা পৃথিবীর মানুষ জেনে যাবে, আর ইসরায়েলের নৃশংসতা দুনিয়ার মানুষ জানবে,
আসলে মাইকেলের মাথায় এই কনসেপ্ট কোথা থেকে এসেছে, তবে এটা নতুন না,এর আগে ও ফ্লোটিলা ছিল, মূলত ফ্লোটিলা স্পেনীশ শব্দ যার অর্থ নৌকার একটা দল,২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ফ্লোটিলার ব্যবহার হয়েছিল, সেই সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন চার্চিল, চার্চিল হিটলারের বিরুদ্ধে ৪ লাখ সৈন্য জার্মানীর বর্ডারে পাঠায়,এতে হিটলার ক্ষিপ্ত হয়ে তার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে ৮ লাখ সৈন্য পাঠায়, এবং সৈন্যদের ঘেরাও করে পিছনে নিতে থাকে, এবং পিছনে যেতে যেতে ওরা সমুদ্রের ধারে চলে আসে, এখানে এসে চার্চিলের সৈন্যরা ফেঁসে যায়, সামনে হিটলারের ৮ লাখ সৈন্য আর পিছনে সমুদ্র, আর তখনই জার্মান বোমারু জেট ব্রিটেনের সৈন্যদের উপর বোমা বর্ষণ করতে থাকে, সে এক নিদারুণ ট্রাজেডি, খোলা জায়গায় লুকানোর কোনো জায়গা নেই, সামনে হিটলারের সৈন্য, পিছনে সাগর, মাথার উপর অবিরাম বোমা বর্ষণ, প্রচুর সৈন্য হতাহত হয়,এই খবর শুনে চার্চিল আমেরিকাকে অনুরোধ করে সাহায্যের জন্য কিন্তু আমেরিকা কোন সাহায্য করবে না বলে জানিয়ে দেয়, তখন চার্চিল ভেঙে পড়ে, তারপর সে তার দেশের সাধারণ নাগরিকদের কাছে সাহায্য চায়, সে বলে যার কাছে নৌকা আছে সে যেন তার ভাইদের রক্ষার জন্য যুদ্ধাহতদের সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং আমাদের সৈনিকদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে, চার্চিলের এই আহবানে অভূতপূর্ব সারা আসে সারা দেশ থেকে, সাধারণ মানুষ কোন অস্ত্র ছাড়াই যার যার নৌকা নিয়ে সৈন্যদের বাঁচাতে এগিয়ে যায়, আর এখান থেকেই আসে ফ্লোটিলার কনসেপ্ট, এসব সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সেই জায়গায় যেয়ে নিজেদের সৈনিক ভাইদের নিয়ে ব্রিটেনে ফিরে আসে,
আর এভাবেই ফ্লোটিলা ৪ লাখ সৈন্যের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ জীবিত সৈন্য নিয়ে দেশে ফিরে আসে,সেটা এখনো একটা অভিনব দৃষ্টান্ত হিসেবে চির অম্লান হয়ে আছে পৃথিবীতে,
এই কনসেপ্ট থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এভাবেই মাইকেল ইসরায়েলের জেল থেকে বের হয়ে সারা দুনিয়া থেকে ফান্ড সংগ্রহ করতে থাকে, তারপর ২০০৮ এ ২টা নৌকা নিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে গাজার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়,এবং গাজায় পৌঁছে, গাজার মানুষের মধ্যে খাবার ঔষধ এবং অন্যান্য সব সামগ্রী বিলিয়ে দেয়, এই খবর সারা দুনিয়া প্রচার করে,
এর দু’বছর পর মাইকেল আর তার সাথীরা ৬ টি নৌকা নিয়ে রওয়ানা হয়, ঐ সময় তুরস্কের সাপোর্ট ছিল, কিন্তু ইসরায়েল এই নৌকাগুলো যেতে দেয়নি,যাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই তাদের উপর ইসরায়েল হামলা করে এবং ঐ হামলায় দশজন মারা যায়, ইসরায়েল মনে করেছে ভয় পেয়ে চলে যাবে কিন্তু তারা সব বাধা উপেক্ষা করে গাজার দিকে যেতে থাকে, কোনো ভাবেই যখন আটকানো যাচ্ছে না তখন ইসরায়েল সবাই কে বন্দী বানিয়ে নিয়ে যায়, আর গাজাবাসীর সব ত্রাণ নিজেরা রেখে দেয়, আর সবাইকে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়,
এরপর ও আরো ফ্লোটিলা এসেছে এবং ইসরায়েল আগের মতো বন্দী করে দেশে পাঠিয়ে দেয়,
এভাবেই যখন আবার যুদ্ধাহত গাজাবাসীকে ত্রাণ ঢুকতে না দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করছে দু’বছর ধরে তখন আবার এই ফ্লোটিলার কনসেপ্ট নিয়ে ৫০ টি জাহাজ ও ৪৪ টিরও বেশি দেশের প্রায় ৫০০ মানুষ এই ফ্লোটিলায় অংশগ্রহন করে, এদের মধ্যে মাত্র ৩০% মুসলিম, আর বাকি সবাই অন্য ধর্মের, এদের মধ্যে ইহুদি ও আছে,
এবারও সেই পুনরাবৃত্তি, সব ফ্লোটিলাতে ইসরায়েল হামলা করে এবং সবাইকে বন্দী করে নিয়ে যায় ইসরায়েল, আর সারা দুনিয়ার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে,
এভাবেই ইসরায়েল গাজাকে ধংস করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আর সাধারণ মানুষ তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে,ইসরায়েলের এই নগ্নতা নৃশংসতা সারা দুনিয়ার শাসকরা দেখে কোনো উদ্যোগ নেয় নি কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের প্রচেষ্টা ভালোবাসা অব্যাহত রেখেছে অসহায় গাজাবাসীর জন্য, সাধারণ মানুষ বসে নেই, এবার দ্বিগুণভাবে ফ্লোটিলা আসবে মানবতার পতাকা তলে,এবারের ফ্লোটিলা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফ্লোটিলা হবে, গাজাবাসীর অবরোধ ভেঙে দিবে,
আর একদিন ইসরায়েলকে মানবতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, ইতিহাস আগে ও কোনো জুলুমবাজকে ক্ষমা করেনি ভবিষ্যতে ও করবে না, প্রকৃতি সুদে আসলে যার যার কর্মফল ফেরত দেয়, ইসরায়েলকে ও এই নিষ্ঠুরতার মূল্য দিতে হবে।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights