ইয়েমেন যুদ্ধে কারা জড়িত, কার কী ভূমিকা

অনলাইন ডেস্ক

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ সৌদি আরব লক্ষ্য করে হামলাও চালিয়েছে তারা।

দীর্ঘদিনের এই সংঘাত শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এতে আঞ্চলিক শক্তি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়েছে। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
সংঘাতের প্রধান পক্ষগুলো হলো—

হুতি
ইরান-সমর্থিত হুতিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। ইয়েমেনের রাজধানী সানা-সহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার মুখেও হুতিরা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এসব সামরিক অভিযান গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হুতিদের পরিচিতি আরও বেড়ে যায়। গাজার প্রতি সংহতি প্রকাশের কথা বলে তারা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ শুরু করে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

হুতিদের কার্যক্রম ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।

সৌদি আরব
ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরব সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ে ২০১৫ সালে। রিয়াদের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল তৎকালীন ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনর্বহাল করা।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দীর্ঘ সামরিক অভিযান সত্ত্বেও হুতিদের ক্ষমতার ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।

তবে পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের অবস্থানে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায়। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তুলনামূলক বাস্তববাদী ও কম সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব ইয়েমেন পরিস্থিতিতেও পড়ে এবং রিয়াদ সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)। ২০২২ সালে কাউন্সিলটি গঠন করা হয়।

দেশ পরিচালনা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া—পিএলসির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কাউন্সিলটিতে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং সামরিক পটভূমির ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এর মূল উদ্দেশ্য হলো হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এবং সরকারের পক্ষে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা।

তবে পিএলসির ভেতরেও বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থ ও মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে হুতিদের মোকাবিলায় একটি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী ঐক্য ধরে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ইসলাহ পার্টি
ইয়েমেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হলো ইয়েমেনি কংগ্রেগেশন ফর রিফর্ম, যা সাধারণভাবে ‘ইসলাহ’ নামে পরিচিত। এটি একটি সুন্নি রাজনৈতিক আন্দোলন, যার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক রয়েছে। ইসলাহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং পিএলসি-নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন সরকারের একটি অংশ হলেও দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে ইসলাহের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। হুতিদের বিরোধিতাকারী বিভিন্ন শক্তির মধ্যে দলটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও পিএলসির ভেতরে থাকা অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে।

ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস
হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি হলো ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস। এটি ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

এই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ। তিনি ইয়েমেনের প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা। তারেক সালেহ ও তার নেতৃত্বাধীন বাহিনী হুতিবিরোধী সামরিক জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিএলসির বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন হুতিবিরোধী শক্তিকে একত্রিত করার প্রচেষ্টায় ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

কেন ইয়েমেনের যুদ্ধ এত জটিল?
ইয়েমেনের সংঘাতকে শুধু হুতি ও সরকারের মধ্যকার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর জটিলতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। একদিকে হুতিরা দেশের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ইরানের সমর্থন পাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সৌদি আরব সমর্থন করছে।

এর পাশাপাশি পিএলসি, ইসলাহ এবং ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক বিভাজনও সংঘাতকে আরও জটিল করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোহিত সাগর ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। গাজা যুদ্ধের পর হুতিদের ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা ইয়েমেনের সংঘাতকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ফলে ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু হুতিদের সঙ্গে সরকারের সমঝোতাই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা, সৌদি আরব ও ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো—সবকিছুর সমন্বিত সমাধান প্রয়োজন।

এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ তাই এখনও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম কঠিন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights